খেলাধুলাভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের দলগত চর্চা, ন্যায্যতা ও অহিংস যোগাযোগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্য নিয়ে ‘ক্র্যাফট মডেল ম্যানুয়াল’–এর আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেছে লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো)। সংস্থাটি ‘School Under the Sky’ কর্মসূচির আওতায় ক্র্যাফট গেমস ব্যবহার করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগে পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করছে।
শনিবার (৭ মার্চ ২০২৬) ঢাকার ওয়াশপুর গার্ডেন সিটির লিডো পিস হোমে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যানুয়ালটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে শিক্ষা, ক্রীড়া, শিশু উন্নয়ন, মানবাধিকার ও সামাজিক উন্নয়ন খাতের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
ক্র্যাফট মডেল বাংলাদেশে তুলনামূলক নতুন এক শিক্ষাধারা, যেখানে খেলাধুলাকে শেখার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লিডোর দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এই ম্যানুয়াল। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৫০টি ক্র্যাফট গেমস, যা শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশে সহায়ক হিসেবে পরিকল্পিত।
অনুষ্ঠানে ক্র্যাফট মডেলের যাত্রা ও কার্যক্রম নিয়ে একটি উপস্থাপনা প্রদর্শন করা হয়। এতে মডেলটির পেছনের ধারণা, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সমাজবিজ্ঞানী সৈয়দ মোসাদ্দেক হোসেন, নাজমুল হাসান, জিসান রহমান ও তাহসিন হক।
লিডোর গ্রান্ট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড প্রপোজাল ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর নাজমুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা পারনভা প্রায় ২০১৩ সালের দিকে লিডোর সঙ্গে এ উদ্যোগে যুক্ত হয়। বিশ্বব্যাপী সংস্থাটি ক্র্যাফট মডেল নিয়ে কাজ করছে এবং বাংলাদেশে লিডোর মাধ্যমেই এই মডেলের যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে নৈতিক শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় ইশপের গল্পের মতো উপকরণ ব্যবহার করতাম। ক্র্যাফট মডেলে শিশুরা খেলার মাধ্যমে শেখার সুযোগ পায়। প্রতিটি খেলার শেষে একটি শিক্ষামূলক বার্তা থাকে, যা শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরেও শেখার নানা পথ রয়েছে এবং খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন লিডোর অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইন্যান্স ডিরেক্টর মুর্শিদা আক্তার কান্তা। তিনি বলেন, ক্র্যাফট মডেল ম্যানুয়ালের প্রকাশ লিডোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। LEEDO এবং PERNOVA–এর যৌথ গবেষণায় তৈরি এই মডেলটি মূলত ‘লার্নিং থ্রু প্লে’ বা খেলার মাধ্যমে শিক্ষার একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি।
তিনি আরও বলেন, এই মডেলটি শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা, নিয়ম মেনে চলা, পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতা, ন্যায্যতা ও দলগত সংহতি—এই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য এটি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে একটি কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। তাঁর মতে, ম্যানুয়ালটি শিক্ষক ও সমাজকর্মীদের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে এবং শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক সামাজিক আচরণ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে অনলাইন কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন পারনভার প্রেসিডেন্ট রজার হাম্বল। তিনি বলেন, এক দশকেরও বেশি আগে লিডোর সঙ্গে বাংলাদেশের পথশিশুদের জন্য ক্র্যাফট মডেলের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। সহজ কিন্তু কার্যকর এসব গেমস শিশুদের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইথিওপিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্র্যাফট গেমস ব্যবহার করা হলেও বাংলাদেশের জন্য তৈরি এই ম্যানুয়ালটি আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। কারণ এতে লিডোর নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের স্থানীয় খেলাধুলার উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মফিদুল হক বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বপ্ন নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যেই বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তাঁর মতে, বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করাই প্রকৃত অর্থে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অন্যতম উপায়, যা লিডো করে যাচ্ছে।
সমাপনী বক্তব্যে লিডোর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন বলেন, শিশুদের উন্নয়নকে কেন্দ্র করেই লিডোর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, কারণ শিশুরাই সমাজের ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, এই ম্যানুয়ালটি বাংলাদেশের শিশুদের বাস্তবতা বিবেচনায় দেশীয় আঙ্গিক ও স্থানীয় খেলাধুলার উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বসনিয়াতেও এ মডেল প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর আশা, এই উদ্যোগ পিছিয়ে পড়া শিশু, নারী ও যুবকদের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিভিন্ন খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের সুপারিনটেনডেন্ট আমরান খান, ইনার হুইল ক্লাব অব লোবেলিয়া ঢাকার প্রেসিডেন্ট সাজেদা আখতার লিপি, এইচআরডিসির নির্বাহী পরিচালক মাহবুল হক, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ফুটবলার শেখ মোহাম্মদ আসলাম, বাংলাদেশ কান্ট্রি গেমস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ও বাংলাদেশ কলেজ ফিজিক্যাল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন, অধ্যাপক রুহুল আমিন, ইআরডিএর নির্বাহী পরিচালক মো. মনির হোসেন চৌধুরী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব একরামুল হক, সেভের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজা কামাল এবং সংবাদ উপস্থাপক ও সিকেডিএলের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর রানি চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ক্র্যাফট মডেল ম্যানুয়াল’ উন্মোচন করা হয়। পরে উপস্থিত অতিথিদের সম্মানে একটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়।