ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি এই নির্বাচনকে তাদের রাজনৈতিক কর্মকৌশলের ‘দ্বিতীয় লড়াই’ হিসেবে দেখছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়র নির্বাচনকে ঘিরে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে জামায়াত। এ কারণে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনেই সংগঠনকে সক্রিয় করে সম্ভাব্য প্রার্থী খোঁজা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি ও প্রেক্ষাপট
আইন অনুযায়ী, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গত ১ মার্চ নির্বাচন ভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ঈদুল ফিতরের পর থেকে সারা বছর ধরে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশনের এই পরিকল্পনাকে সামনে রেখে জামায়াতও নিজেদের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
‘দ্বিতীয় লড়াই’ হিসেবে স্থানীয় নির্বাচন
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের জন্য নতুন রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সিলেটে দলীয় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন,
“এখন আমাদের দ্বিতীয় লড়াই শুরু হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। এই লড়াইয়ে একটা জায়গাও যেন খালি না থাকে। এই নির্বাচনে যাঁরা জীবন বাজি রেখে আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, সমাজের সেসব জায়গা থেকে ভালো লোকগুলোকে বের করে এনে তাঁদের হাতে আমরা দায়িত্ব তুলে দিতে চাই।”
তার এই বক্তব্যের পরদিন ঢাকায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অন্যান্য সাংগঠনিক বিষয় ছাড়াও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে অগ্রাধিকার
বৈঠক–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত।
এই নির্বাচনের জন্য স্থানীয় সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করা হয়েছে। মহানগর ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তিন সদস্যের একটি প্যানেল তৈরি করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।
এই তালিকা যাচাই–বাছাই করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক অঞ্চলের নেতাদের ওপর।
জানা গেছে, জামায়াতের ১৪টি সাংগঠনিক অঞ্চলের পরিচালকরা জেলা ও উপজেলার আমির, সেক্রেটারি এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রার্থী বাছাই করবেন।
উল্লেখ্য, গত ২০ ফেব্রুয়ারি সারা দেশকে ১৪টি সাংগঠনিক অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য একজন করে পরিচালক নিয়োগ দেয় জামায়াত।
প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামত
দলীয় সূত্র বলছে, ইতিমধ্যে কিছু জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের সম্ভাব্য প্রার্থী প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি স্থানগুলোতে প্রার্থী নির্ধারণের কাজ চলমান রয়েছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে জেলা ও মহানগর সংগঠনগুলোকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার ওপর জোর দিচ্ছে দলটি।
প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান—যেমন জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করে।
এরপর প্রায় দেড় বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। একই সময় সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে ছয়টি সিটিতে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয়, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা–সমালোচনা দেখা গেছে।
জোটগত নাকি আলাদা নির্বাচন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগতভাবে হবে নাকি দলভিত্তিক আলাদাভাবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি তুলেছিল জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, দ্রুতই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তবে জামায়াতের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনে জোট থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীরা আলাদা হতে পারেন।
দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন,
“স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে প্রার্থী দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জোট থাকবে, কিন্তু নির্বাচনে প্রার্থী আলাদা থাকবে।”
দলীয় প্রতীক নাকি নির্দলীয় নির্বাচন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে নাকি নির্দলীয়ভাবে—এ নিয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালু করতে আইন সংশোধন করেছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই বিধান বাতিল করে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
এই অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তোলা হবে। সেটি আইন আকারে পাস হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, বিষয়টি সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
জামায়াতের নেতারাও মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হওয়াই উত্তম।
দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান বলেন,
“স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন দুটি ভিন্ন বিষয়। তাই স্থানীয় নির্বাচন আলাদা প্রতীকে হওয়া উচিত।”
একই মত দিয়েছেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তাঁর মতে, দলীয় প্রতীক না থাকলে ভোটাররা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবেন।
সব মিলিয়ে জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নতুন করে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হচ্ছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সংগঠনকে পুনর্গঠনের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থী খোঁজার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।