ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও তাদের মিত্র ১১ দলের অনেক নেতাকে পরিকল্পিতভাবে হারানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, নির্বাচনে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” ও কারচুপির মাধ্যমে বেশ কয়েকজন সম্ভাবনাময় প্রার্থীকে পরাজিত করা হয়েছে।
রোববার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরের হালিমা খাতুন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এনসিপির বিভাগীয় ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব অভিযোগ করেন। দলটির প্রতিষ্ঠার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ
নাহিদ ইসলাম বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক জায়গায় ফলাফলে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনে এনসিপি ও ১১ দলীয় জোটের কয়েকজন নেতাকে পরিকল্পিতভাবে হারানো হয়েছে।
তিনি বলেন,
“কারচুপি যে হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলম ও দিনাজপুরের আহাদ। তাঁদের ফলাফলে কারচুপি করে হারানো হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের জোটের আরও অনেক নেতাকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হারানো হয়েছে।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সংসদে শপথ নেওয়ার ব্যাখ্যা
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ থাকলেও গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এনসিপি ও তাদের জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে শপথ নিয়েছেন বলে জানান নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন,
“নির্বাচনে নানা ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং হওয়া সত্ত্বেও দেশের গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে আমাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদে শপথ নিয়েছেন।”
একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, সরকার গঠন করা দলটি নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি।
সরকারের সমালোচনা
সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন,
“সরকার গঠনের এক মাসও হয়নি, কিন্তু আমরা দেখছি দেশ কোন দিকে যাচ্ছে। আজকে বাংলাদেশ ব্যাংকে মব সৃষ্টি করে ব্যাংকটি দখলের চেষ্টা হচ্ছে। ঋণখেলাপিদের সংসদে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দুদকের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, দেশে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বললেও হয়রানির শিকার হতে হতে পারে।
তার ভাষায়,
“আমরা এমন একটি দেশের দিকে যাচ্ছি, যেখানে চাঁদাবাজকে আপনি চাঁদাবাজ বলতে পারবেন না। তাকে চাঁদাবাজ বললে আপনার বিরুদ্ধে মামলা হবে। সেই পুরোনো কায়দা, সেই পুরোনো সিস্টেম আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।”
সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, দেশের জনগণ সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে ভোট দিলেও সরকার তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে।
তিনি বলেন,
“জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু আমরা দেখছি সরকার নানা কৌশলে সেই সংস্কার বাস্তবায়ন থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারা গণভোটের বৈধতাকে আদালতে নিয়ে গিয়ে গণভোট এবং বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”
তিনি জানান, আগামী ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশনে সংস্কার পরিষদ গঠন না হলে এনসিপি নতুন কর্মসূচি দিতে পারে।
“আমরা অপেক্ষা করছি। যদি সংসদে সংস্কার পরিষদ গঠন না হয়, তাহলে আমাদের নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য আবারও রাজপথে নামতে হবে,” বলেন তিনি।
জ্বালানি সংকটের অভিযোগ
দেশে জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষ পেট্রোলপাম্পে গিয়ে জ্বালানি পাচ্ছেন না।
নাহিদ ইসলাম বলেন,
“আপনারা পাম্পে গেলে পেট্রল পাবেন না। সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পায় না। কিন্তু সরকারি দলের লোকজন ও কর্মকর্তারা ঠিকই তেল পাচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, বিভাগীয় সফরে গিয়ে তাঁরাও অনেক সময় পাম্পে পাম্পে ঘুরেও জ্বালানি পাননি।
বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা
সরকার গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন,
“ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে পরিবর্তন করা হয়েছে। একজন দলীয় ও অযোগ্য ব্যক্তিকে সেখানে নিয়োগ দিয়ে জুলাই গণহত্যার বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
অন্য নেতাদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম (আদীব) এবং দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী।
বক্তব্যে বিএনপির নেতৃত্বের সমালোচনা করে নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী বলেন,
“আপনারা যদি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পথ থেকে সরে যান, তাহলে দেশের মানুষ আপনাদেরও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে, যেভাবে শেখ হাসিনাকে করেছে।”
এনসিপির নেতারা বলেন, দেশের গণতন্ত্র, বিচার ও সংস্কারের প্রশ্নে তারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকবে এবং প্রয়োজন হলে আন্দোলনের পথেও যেতে প্রস্তুত রয়েছে দলটি।