ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ঢুকে একটি কলেজের কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষার কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সভাপতির বিরুদ্ধে। শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসন ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মেদিনী সাগর বিএম মহাবিদ্যালয়–এ পরিছন্নতাকর্মী ও আয়া পদে নিয়োগের জন্য সম্প্রতি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। শুক্রবার ওই দুই পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষে নিয়োগ–সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা চলার সময় উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিন দলীয় নেতা–কর্মীদের নিয়ে ইউএনও কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
‘মব সৃষ্টি’ ও বাগ্বিতণ্ডা
অভিযোগ রয়েছে, জামাল উদ্দিনের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির নেতা ইরফান আলী, যুবদলের সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, যুবদল নেতা মো. ফারুক, মোখলেসুর রহমানসহ ২৫ থেকে ৩০ জন নেতা–কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানান এবং ইউএনওর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে জামাল উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, তিনি বিষয়টি তাঁর দলের মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলে এসেছেন এবং রাতের বেলায় অফিসে নিয়োগ–সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে ইউএনও বলেন, “রাতের বেলায় আমি অফিস করব, সেটা তো একান্ত আমার বিষয়। আমাদের অফিস চব্বিশ বাই সেভেন।”
একপর্যায়ে জামাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, “আপনি নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্য শুরু করেছেন।” এ সময় উপস্থিত একজনকে বলতে শোনা যায়, “আপনি অফিস রাতে বা দিনে করেন, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আগের ইউএনও বিকাশ চন্দ্র বর্মন ছিলেন, তাকেও আমরা সেভ করেছি।” উত্তরে ইউএনও বলেন, “এই মব কালচার করে তখনো কিন্তু এ রকম করা হয়েছিল।”
বিতর্কের এক পর্যায়ে জামাল উদ্দিন বলেন, “আপনি আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্টদের নিয়োগ দেবেন, এটা মানা হবে না।” জবাবে ইউএনও বলেন, “অধ্যক্ষ যদি অবৈধ হয়, বোর্ডকে বলেন নিয়োগ বাতিল করতে, আমাদের অসুবিধা কোথায়?”
কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
বাগ্বিতণ্ডার মধ্যেই জামাল উদ্দিন তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশে বলেন, “এই প্রিন্সিপালকে নিয়ে বাইরে চলো।” এরপর নেতা–কর্মীরা কলেজের অধ্যক্ষ ও নিয়োগ পরীক্ষার সদস্যসচিব হারুন অর রশিদকে বাইরে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। এ সময় অধ্যক্ষের কাছ থেকে ফাইলপত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি জাবেদ আলীর কাছ থেকেও নিয়োগ–সংক্রান্ত কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অধ্যক্ষের কাছ থেকেও কিছু কাগজপত্র নিয়ে নেতা–কর্মীরা কার্যালয় ত্যাগ করেন। অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদ তাঁদের পিছু নেন।
অধ্যক্ষের অভিযোগ
অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদ বলেন, “উপজেলা বিএনপির সভাপতি লোকজন নিয়ে এসে নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধের জন্য ইউএনওকে হুমকি–ধমকি দেন। একপর্যায়ে তাঁরা পরীক্ষার কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যান। কাগজপত্র ফেরত পেতে আমি তাঁদের হাত–পা পর্যন্ত ধরেছি।”
বিএনপি নেতার বক্তব্য
অভিযোগ অস্বীকার না করে জামাল উদ্দিন বলেন, তাঁদের কাছে তথ্য ছিল ইউএনও নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন করেছেন এবং দরজা বন্ধ করে সীমিতসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। “এটার প্রতিবাদ করতে ছেলেরা সেখানে গিয়েছিল। ইউএনও তাঁদের পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখান। বিষয়টি জানার পর আমি সেখানে যাই। নিয়োগ–বাণিজ্য নিয়ে তাঁর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়,” বলেন তিনি।
তবে কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, পরে সেগুলো ইউএনও কার্যালয়েই ফেলে আসা হয়েছে।
প্রশাসনের অবস্থান
ইউএনও রায়হানুল ইসলাম বলেন, “নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মব বাহিনী নিয়ে এসে পরীক্ষা বন্ধের দাবি জানান। রাজি না হওয়ায় তাঁরা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন এবং কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে চলে যান।” এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান।
ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি দপ্তরে ঢুকে চলমান নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এ ধরনের হস্তক্ষেপ প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।