ঢাকা

মোসাদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ, ইরানের জানুয়ারির বিক্ষোভ–হত্যাকাণ্ডে সন্দেহ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানে সংঘটিত বিক্ষোভ ও হত্যাকাণ্ড এখনও বহু মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। স্থানীয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব দেওয়া কিছু ব্যক্তি হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সাধারণ পথচারীদের লক্ষ্য করে বিদেশি অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি ইরানিদের মধ্যে একাধিক তত্ত্ব ও সন্দেহ তৈরি করেছে: তারা কি সত্যিই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ–এর সরাসরি তৎপরতা দেখছিলেন?

সরকার বিরোধী বিক্ষোভের চাপের মধ্যে বিদেশি প্রভাব

ইরানিদের কাছে জানুয়ারির বিক্ষোভ যেন অনেক আগের কথা। সরকারবিরোধী আন্দোলন ও সেই সময়ের দমন–পীড়নের ভয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হুমকি এবং সম্ভাব্য স্থল অভিযানের ভয়-উদ্বেগের সঙ্গে মিলিয়ে এখন তুচ্ছ মনে হচ্ছে। তবুও, বিক্ষোভ চলাকালীন ঘটে যাওয়া কিছু অদ্ভুত ও অমীমাংসিত ঘটনা এখনও মানুষের মনে খচখচ করছে।

এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ছদ্মবেশে এক ব্যক্তিকে দেখেছিলেন, যিনি হঠাৎ পকেট থেকে রিভলবার বের করে একটি শান্ত গলিতে দুই তরুণীকে গুলি করেছিলেন। অন্য সূত্রে বলা হয়েছে, কিছু সুসংঘবদ্ধ দল ‘ব্ল্যাক ব্লক’–এর মতো পোশাক পড়ে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। আবার কিছু নিহতের শরীরে এমন অস্ত্রের আঘাত দেখা গেছে, যা সাধারণত ইরানের সরকারি বাহিনী ব্যবহার করে না।

আন্দোলনের বিস্তার ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বছরের শুরুতে ইরানে দেশব্যাপী এই সর্বশেষ বিক্ষোভ শুরু হয় মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে। দ্রুত এটি পুরো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়।

বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং ইসরায়েলের ঐতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু দাবি করেছেন, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মোসাদের এজেন্টরা সক্রিয় ছিলেন। ন্যাশনাল মিডিয়া সূত্রে জানা গেছে, মোসাদ ইরানে এজেন্টদের মাধ্যমে নতুন গণ–অভ্যুত্থান ঘটাতে সক্ষম।

প্রত্যক্ষদর্শী ও নিরাপত্তা সূত্র

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, তেহরানের উপকণ্ঠে তিনি এমন কিছু মানুষ দেখেছেন, যারা স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন না এবং তারা বড় সড়ক আটকে বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। অন্য এক সূত্র বলছে, মাস্ক পরা একটি ছোট দল স্লোগান দিয়ে মানুষদের পরিচালনা করছিল এবং অল্প সময়ের মধ্যে উধাও হয়ে যেত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অজ্ঞাত আততায়ীরা সাধারণ পথচারীদের উদ্দেশ্যহীনভাবে গুলি করেছিল। সরকারি বাহিনীও অনেক মানুষ হত্যা করেছে, তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে কিছু ঘটনা সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনীর কাজের মতো ছিল না। উত্তর ইরানের কাস্পিয়ান সাগরের কাছের একটি শহরে ছাদ থেকে একজন বাসিন্দা দেখেছেন, দুজন তরুণী হঠাৎ বন্দুকধারীর লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়েন।

মোসাদ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ

ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, কিছু হত্যাকাণ্ডে মোসাদের এজেন্টরা যুক্ত ছিল। নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেহেদি খারাতিয়ান এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে লেবাননের ২০২৪ সালের পেজার হামলার তুলনা করেছেন। তারা বলছেন, “ইরানে রক্ত ঝরানো আন্তর্জাতিক মতামত প্রভাবিত করতে এবং সামরিক হামলার পথ প্রশস্ত করতে প্রয়োজনীয় ছিল।”

মোসাদ বছরের পর বছর ধরে ইরানে এজেন্ট পরিচালনা করে আসছে, এবং বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত—পারমাণবিক বিজ্ঞানী, সামরিক কমান্ডার এবং হামাসের নেতা ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা করার মতো কর্মকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।

হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা ও মানবাধিকার সংস্থার দাবী

৮ জানুয়ারি থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ দমন করতে শুরু করলে, সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় ৩,১১৭ জন নিহত হয়। বিরোধী দল এবং মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ দাবি করছে, প্রকৃত সংখ্যা অন্তত ৭,০১৫ জন। অনেক নিহতের শরীরের আঘাত সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্রের সঙ্গে মেলেনি, যা ইঙ্গিত দেয় বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা।

নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই

তবে তেহরানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বলেন, এইসব দাবির এখনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, “মানুষের বিশ্বাসের সীমা এবং চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এ ধরনের দাবিকে গ্রহণ করা কঠিন।” তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্মের ক্ষোভ অতীতের তুলনায় অনেক বেশি এবং তারা যুক্তি বোঝে না।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স