ঢাকা

বর্তমান যুদ্ধে আপসের সুযোগ ক্ষীণ, বলছেন বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলী শাবানি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বেসামরিক স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ও আমওয়াজ ডট মিডিয়ার সম্পাদক মোহাম্মদ আলী শাবানি সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘মুখ রক্ষা করে’ পিছু হটার বাস্তবসম্মত সুযোগ এখন আর যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কোনো পক্ষের কাছেই নেই।

‘দ্বৈরথের’ মতো পরিস্থিতি

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাবানি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার যে হুমকি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে তিনি প্রস্তুত আছেন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি এখন অনেকটা ‘ডুয়েল’ বা দ্বৈরথের মতো—যেখানে একবার অস্ত্র তোলা হলে সম্মান বজায় রেখে সরে আসার পথ সংকুচিত হয়ে যায়।

শাবানির আশঙ্কা, এই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে না এলে অল্প সময়ের মধ্যেই তা পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে আগামী ২৪ ঘণ্টাকে তিনি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার বিস্তার

সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়েতে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সদর দপ্তরসংলগ্ন এলাকায় আগুন লাগে। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও লবণাক্ত পানি শোধনাগারেও আঘাত হানার কথা নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটি থেকে আল–জাজিরার সাংবাদিক মালিক ত্রাইনা জানান, গভীর রাতে শহরজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। ভোরের দিকে সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে দুটি বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারে হামলার তথ্য জানানো হয়। এতে দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

কুয়েতের জন্য ‘রেড লাইন’

বিশ্লেষকদের মতে, লবণাক্ত পানি শোধনাগার কুয়েতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির পানীয় জলের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত আটটি শোধনাগার থেকে। ফলে এসব স্থাপনায় হামলাকে কুয়েত কর্তৃপক্ষ ‘রেড লাইন’ অতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করছে।

কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, রাজধানী থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে আল-শুওয়াইখ এলাকার তেল কমপ্লেক্সে হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ একাধিক সরকারি ভবন লক্ষ্য করেও আঘাত হানা হয়েছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে সাময়িকভাবে বাসা থেকে অনলাইনে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভৌগোলিকভাবে কুয়েত ইরানের নিকটবর্তী এবং ইরাকের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নেওয়ায় দেশটির নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। কুয়েত প্রশাসনের ধারণা, কিছু হামলা ইরাক সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে চালানো হয়ে থাকতে পারে।

বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অগ্নিকাণ্ড

বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, যাতে আগুন ধরে যায়। তবে জরুরি উদ্ধারকারী দল দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। রাজধানী মানামায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানানো হয়।

এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আল-বুরুজ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানির স্থাপনায় আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগ্নিনির্বাপণ দল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া

এর আগে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। পাশাপাশি বাহরাইনে বাপকো এনার্জির জ্বালানি মজুত ট্যাংকে হামলার ঘটনাও নিশ্চিত করা হয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে ধারাবাহিক হামলা বিশ্ববাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

সংঘাতের দিকনির্দেশনা

মোহাম্মদ আলী শাবানির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উভয় পক্ষই এখন এমন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামান্য ছাড় বা কূটনৈতিক পশ্চাদপসরণ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিকভাবে দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতে পারে। ফলে সামরিক প্রদর্শন ও পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জড়িয়ে পড়া এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাতের ধারাবাহিকতা বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এখন নজর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দিকে—সংঘাত কি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরও বিস্তৃত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স