ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো দেশে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি বা অন্য কোনো কাজে যুক্ত থাকেন। আবার কিছু দেশে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এ ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও জার্মানি এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে রোমানিয়া, গ্রিস ও ক্রোয়েশিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করা শিক্ষার্থীর হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
শিক্ষার্থীদের কাজ করার পেছনে আর্থিক প্রয়োজনের পাশাপাশি কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের প্রবণতা যেসব দেশে বেশি
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটিতে শিক্ষার্থীদের ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ পড়াশোনার পাশাপাশি কোনো না কোনো কাজে যুক্ত রয়েছেন। অর্থাৎ দেশটির শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে কর্মজীবনেরও সমন্বয় করছেন।
এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক। দেশটির ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেন। অন্যদিকে জার্মানিতে এ হার ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
শিক্ষার্থীদের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, এসব দেশে পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মজীবনে অংশগ্রহণের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে বিভিন্ন দেশে শিক্ষাব্যবস্থা, শ্রমবাজারের সুযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক পরিস্থিতির মতো বিষয় এ প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করা শিক্ষার্থীদের হারের ভিত্তিতে শীর্ষ তিনটি দেশ হলো—
নেদারল্যান্ডস: ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ
ডেনমার্ক: ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ
জার্মানি: ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ
যেসব দেশে শিক্ষার্থীদের কাজ করার হার সবচেয়ে কম
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার প্রবণতা সমান নয়। কয়েকটি দেশে এ হার বেশ কম।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রোমানিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেন মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে গ্রিস, যেখানে এ হার ৬ শতাংশ। ক্রোয়েশিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেন ৬ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।
অর্থাৎ নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে তুলনা করলে এসব দেশে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করা শিক্ষার্থীদের হার অনেক কম। তবে শুধু এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা কেন কাজ করছেন না, তার নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায় না। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শ্রমবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি, চাকরির সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থার মতো বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করা শিক্ষার্থীদের হার সবচেয়ে কম এমন তিনটি দেশ হলো—
রোমানিয়া: ২ দশমিক ৪ শতাংশ
গ্রিস: ৬ শতাংশ
ক্রোয়েশিয়া: ৬ দশমিক ৪ শতাংশ
চাকরি খোঁজার প্রবণতায় এগিয়ে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড
পড়াশোনার পাশাপাশি সরাসরি কাজে যুক্ত থাকা এবং কাজের সন্ধান করা এক বিষয় নয়। কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করতে পারেন, আবার কেউ কাজের সুযোগ খুঁজলেও তখনো চাকরি নাও পেতে পারেন। এ কারণে চাকরি খোঁজার পরিসংখ্যান শিক্ষার্থীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে সুইডেন এগিয়ে রয়েছে। দেশটিতে এ হার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। ফিনল্যান্ডে চাকরি খোঁজেন ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ডেনমার্কে এ হার ৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
এ পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, এসব দেশের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছেন। তবে চাকরি খোঁজার হার বেশি হলেই যে সংশ্লিষ্ট দেশে চাকরি পাওয়া সহজ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অন্যদিকে রোমানিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি খোঁজার হার মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। ক্রোয়েশিয়া, চেকিয়া ও হাঙ্গেরিতে এ হার শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ করে।
চাকরি খোঁজার হারে এগিয়ে থাকা দেশগুলো হলো—
সুইডেন: ১৪ দশমিক ১ শতাংশ
ফিনল্যান্ড: ১০ শতাংশ
ডেনমার্ক: ৯ দশমিক ৬ শতাংশ
অন্যদিকে সবচেয়ে কম হার রয়েছে—
রোমানিয়া: শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ
ক্রোয়েশিয়া: শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ
চেকিয়া: শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ
হাঙ্গেরি: শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ
আর্থিক প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতা অর্জন—দুই কারণেই কাজ করেন শিক্ষার্থীরা
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার অন্যতম প্রধান কারণ আর্থিক প্রয়োজন। অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের পড়াশোনার খরচ, বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যয় মেটাতে চাকরি করেন। বিশেষ করে যেসব দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি, সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে অর্থ উপার্জনই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করেন। কাজের মাধ্যমে তাঁরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি চাকরি বা অবৈতনিক ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।
গবেষণা সংস্থা র্যান্ড ইউরোপের গবেষক ম্যাডেলিন নাইটিঙ্গেলের মতে, কিছু শিক্ষার্থী মূলত আর্থিক প্রয়োজনের কারণে কাজ করেন। অন্যদিকে কেউ কেউ চাকরি কিংবা অবৈতনিক ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নিজেদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়াতে আগ্রহী।
অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের কাজ করার পেছনে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত পরিকল্পনা—দুই ধরনের বিবেচনাই কাজ করে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে বাড়ে কর্মসংস্থানের হার
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার প্রবণতার ক্ষেত্রে বয়সও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণের হার বাড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে কর্মসংস্থানের হার উল্লেখযোগ্য।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের কর্মসংস্থানের হার ৬২ শতাংশ। একই বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৭১ দশমিক ৯ শতাংশ।
অর্থাৎ এ বয়সসীমায় পুরুষদের কর্মসংস্থানের হার নারীদের তুলনায় বেশি। তবে শুধু এ পরিসংখ্যান দিয়ে এ পার্থক্যের কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, পারিবারিক দায়িত্ব, শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে একই বয়সী নারীদের ১৬ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমবাজারের বাইরে ছিলেন এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষায়ও যুক্ত ছিলেন না। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান কর্মসংস্থান ও শিক্ষার বাইরে থাকা তরুণ-তরুণীদের পরিস্থিতিতে নারী-পুরুষের মধ্যে একটি ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকার হার বেশি হওয়ায় বিষয়টি শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার সঙ্গে কর্মজীবনের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার প্রবণতা দেশভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও জার্মানিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে রোমানিয়া, গ্রিস ও ক্রোয়েশিয়ায় হার অনেক কম।
একই সঙ্গে চাকরি খোঁজার প্রবণতা এবং বয়সভিত্তিক কর্মসংস্থানের হার বিশ্লেষণ করলে শিক্ষার্থীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। কারও কাছে কাজ করা পড়াশোনার খরচ মেটানোর প্রয়োজন, আবার কারও কাছে এটি ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের প্রস্তুতি।
তবে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার ক্ষেত্রে আয়, কাজের সময়, শিক্ষার চাপ এবং কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি তাঁদের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং দক্ষতা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তথ্যসূত্র: এমএসএস