তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পরও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এবং সামরিক নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে—প্রয়োজনে ইরানে আবারও অভিযান চালাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত, তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সেই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে বলে জানিয়েছে The New York Times।
পেন্টাগনের কঠোর বার্তা: ‘আলোচনা বা শক্তি—দুই পথই খোলা’
পেন্টাগনে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী Pete Hegseth দাবি করেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান সামরিক ও কৌশলগতভাবে “অপমানিত ও দুর্বল” অবস্থায় পড়েছে। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পথ বেছে নেবে, না হলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে।
একই ব্রিফিংয়ে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় আছে এবং নির্দেশ পেলেই তারা পুনরায় অভিযান শুরু করতে সক্ষম।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পরও সামরিক বিকল্পকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখা হয়নি।
যুদ্ধবিরতির পর রাজনৈতিক বাস্তবতা: ট্রাম্পের জন্য নতুন চাপ
গত মঙ্গলবার ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এর ভেতরেই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদি আলোচনায় অগ্রগতি না হয়, তবে নতুন যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার দায় সরাসরি হোয়াইট হাউসকেই নিতে হবে।
জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব: দাম কমলেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ইতিমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারে নেমেছে।
এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে, প্রধান সূচকগুলো প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় বাজার পুরোপুরি ফিরে যাবে—এমন সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
ট্রাম্পের কৌশলগত হিসাব: যুদ্ধ নয়, অর্থনীতি এখন অগ্রাধিকার?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট Donald Trump দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অনিচ্ছুক।
কারণ—
যুদ্ধ শুরু হলে তেলের দাম আবার বাড়তে পারে
বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে
নির্বাচনী রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে
বর্তমানে তেলের দাম কমে যাওয়া এবং শেয়ারবাজার চাঙা থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ইরানের পাল্টা সক্ষমতা: যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইরান বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন এমন অবস্থানে রয়েছে যেখানে উভয় পক্ষই একে অপরকে বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে হামলা চালাতে পারে, কিন্তু ইরানও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে—যা ওয়াশিংটনের জন্য বড় ঝুঁকি।
অতীত ভুল ও কৌশলগত ব্যর্থতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগেই ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কৌশলগত ভুল পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে—
মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া সামরিক সিদ্ধান্ত
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ভুলভাবে মূল্যায়ন
আঞ্চলিক মিত্রদের অপ্রস্তুত রাখা
এর ফলে প্রথম দফার সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সমর্থন পায়নি।
সামরিক প্রস্তুতি বনাম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী উচ্চ সতর্কতায় থাকলেও সাবেক কমান্ডারদের মতে, নতুন কোনো অভিযান চালাতে গেলে শত শত বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন হবে এবং এতে বড় ধরনের প্রাণহানি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হবে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধও বাড়ছে। কংগ্রেসে যুদ্ধ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে।
ইউরেনিয়াম ইস্যু ও নতুন সংঘাতের সম্ভাবনা
পেন্টাগনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত হতে পারে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর।
তবে সামরিক সূত্রগুলো সতর্ক করে বলছে, এ ধরনের সম্পদ জোর করে উদ্ধার করতে গেলে তা একটি পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানে রূপ নিতে পারে।
এই বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের হাতেই থাকবে।
উপসংহার: শান্তি না সংঘাত—সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে ওয়াশিংটন
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে—
সামরিক বাহিনী প্রস্তুত
কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্বিধায়
বৈশ্বিক অর্থনীতি অনিশ্চয়তায়
এবং ইরানও পাল্টা সক্ষমতা দেখিয়ে যাচ্ছে
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে আলোচনার অগ্রগতি না হলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে—যার দায় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই বহন করতে হবে।