ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” হয়েছে—এমন কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালিতে চলমান সামরিক অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে।
ট্রুথ সোশ্যাল থেকে ঘোষণা
নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, আপাতত সামরিক অভিযান স্থগিত রাখা হচ্ছে, যাতে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয় কি না তা যাচাই করা যায়।
তিনি লেখেন, “পারস্পরিকভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি নৌ অবরোধ বহাল থাকবে, তবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে, যাতে চুক্তি স্বাক্ষরের সুযোগ তৈরি হয়।”
ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযান বাস্তবায়নের বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করেছিলেন।
‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ কী ছিল
গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ছিল একটি মার্কিন সামরিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পারাপারে সহায়তা করা।
এই জলপথে চলমান উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংঘাতের পটভূমি
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করে। এরপর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত আংশিক অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে অবরোধ আরোপ এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।
তেল বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব
ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে পতন দেখা যায়। ফিউচার মার্কেটে ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে, যা সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসীমা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন মূলত কূটনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা কমার ইঙ্গিত হিসেবে বাজারে প্রতিফলিত হয়েছে।
মার্কিন অবস্থান ও সামরিক কার্যক্রম
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সূত্র জানায়, অভিযানের সময় ইরানের কয়েকটি ছোট নৌযান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এই অভিযানের মূল লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রশাসন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেন, “অভিযান এপিক ফিউরি শেষ হয়েছে। নতুন কোনো সংঘাত আমরা চাই না।”
ইরান ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। কূটনৈতিক পর্যায়ে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
আব্বাস আরাগচি জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি চীন সফরে গিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে এই সামরিক–কূটনৈতিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি সরবরাহ, জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মধ্যবর্তী রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে বলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযান স্থগিত হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বরং ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের সিদ্ধান্তকে অনেকেই সাময়িক কৌশলগত বিরতি হিসেবে দেখছেন। ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনার ফলাফলই নির্ধারণ করবে, এই উত্তেজনা দীর্ঘমেয়াদে কোন পথে গড়াবে।