কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইকে ঘিরে ইলন মাস্কের সঙ্গে চলমান আইনি লড়াই নতুন মোড় নিয়েছে। আদালতে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষ্যে উঠে এসেছে, ওপেনএআইকে লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তর এবং এর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পক্ষে ছিলেন মাস্ক—যার পেছনে তাঁর বহুল আলোচিত মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অর্থায়নের লক্ষ্যও জড়িত ছিল।
এই বিস্ফোরক দাবি করেছেন ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে চলমান মামলায় দ্বিতীয় দিনের মতো সাক্ষ্য দেন।
আদালতে ওপেনএআই বনাম ইলন মাস্ক
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালতে ওপেনএআই এবং এর শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ওপেনএআই তাদের প্রতিষ্ঠাকালীন অলাভজনক লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার পথে গেছে।
এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং এর ফলাফল ওপেনএআইয়ের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘মঙ্গল শহর’ পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের দাবি
ব্রকম্যানের সাক্ষ্যে বলা হয়, ২০১৭ সাল থেকেই মাস্ক ওপেনএআইকে একটি বাণিজ্যিক কাঠামোয় রূপান্তরের পক্ষে ছিলেন। কারণ, উন্নত এআই গবেষণার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল, যা অলাভজনক কাঠামোর মাধ্যমে সংগ্রহ করা কঠিন।
তিনি আদালতে জানান, সেই সময় মাস্ক স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেন যে তিনি ওপেনএআইয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চান। এর পেছনে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিল মঙ্গল গ্রহে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর গড়ে তোলা।
ব্রকম্যানের ভাষায়, “তিনি বলেছিলেন, মঙ্গল গ্রহে শহর গড়তে তাঁর প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য পূরণে তিনি ওপেনএআইয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চান এবং ভবিষ্যতে সেই নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার সিদ্ধান্তও নিজের হাতে রাখতে চান।”
এই বক্তব্য মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কিত অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওপেনএআইয়ের অর্থনৈতিক রূপান্তর
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পর ওপেনএআই তার কাঠামো পরিবর্তন করে অলাভজনক সংস্থা থেকে একটি ‘লিমিটেড প্রফিট’ মডেলে রূপান্তরিত হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু করে।
ব্রকম্যান জানান, ২০২৬ সালের মধ্যে কেবল কম্পিউটিং অবকাঠামোতেই ওপেনএআইয়ের ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারে। এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি গবেষণা, অবকাঠামো ও সম্প্রসারণে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছে।
বিশ্বব্যাপী আলোচিত ChatGPT চালুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ও বিনিয়োগ আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
মাস্কের অভিযোগ ও ক্ষতিপূরণ দাবি
মামলায় মাস্ক অভিযোগ করেছেন, ওপেনএআই এবং এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান তাঁকে ভুল তথ্য দিয়ে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করিয়েছিলেন। পরে তারা সেই লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বাণিজ্যিক লাভকে অগ্রাধিকার দেয়।
মাস্ক এখন ১৫ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন এবং ওপেনএআইয়ের বর্তমান নেতৃত্বকে অপসারণের দাবিও তুলেছেন।
বৈঠকে উত্তেজনা ও নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ
ব্রকম্যান আদালতে আরও জানান, ২০১৭ সালের এক বৈঠকে মাস্ক দাবি করেন, নিজের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি ওপেনএআইয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা পাওয়ার যোগ্য।
সেই বৈঠকে তিনি অল্টম্যানকে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন।
ব্রকম্যান বলেন, আলোচনার এক পর্যায়ে মাস্ক উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং একপর্যায়ে সভা ত্যাগ করার আগে অর্থায়ন বন্ধ রাখার হুমকি দেন।
তিনি আরও জানান, মাস্ক এক পর্যায়ে এত দ্রুত তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন যে তিনি ভেবেছিলেন শারীরিক আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। পরে মাস্ক ক্ষুব্ধভাবে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন।
সম্পদ, শেয়ার ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব
মামলার প্রমাণ হিসেবে ব্রকম্যানের একটি পুরোনো ডায়েরির অংশও উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন—“কোনটি আমাকে এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দিতে পারে?”
এছাড়া আদালতে তিনি জানান, ওপেনএআই এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তাঁর শেয়ারের মূল্য কয়েক হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তথ্য মামলাটিকে শুধু আদর্শিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং প্রযুক্তি খাতের বিপুল আর্থিক স্বার্থের লড়াই হিসেবেও সামনে আনছে।
ওপেনএআইয়ের অবস্থান
ওপেনএআই কর্তৃপক্ষের দাবি, মাস্ক মূলত কোম্পানি ছাড়ার পর এর সাফল্য দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, মাস্কের উদ্দেশ্য এখন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং নিজের এআই প্রতিষ্ঠান xAI-কে শক্তিশালী করা।
বিশ্লেষণ
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলা কেবল একটি কোম্পানির কাঠামোগত বিরোধ নয়; বরং ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিফলন।
মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন থেকে শুরু করে ট্রিলিয়ন ডলারের এআই বাজার—সব মিলিয়ে এই মামলার ফলাফল প্রযুক্তি দুনিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।