ঢাকা

সিইসি অপসারণে আদালতের আশ্রয় নিতে চায় কংগ্রেসসহ বিরোধীরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে পদচ্যুত করার লক্ষ্যে বিরোধী দলগুলোর আনা অভিশংসন নোটিশ লোকসভা ও রাজ্যসভায় খারিজ হয়ে যাওয়ার পর এবার আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী জোট। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন একই দিনে পৃথকভাবে নোটিশ দুটি খারিজ করে দেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

গত বুধবার এ সিদ্ধান্তের পর কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, আরজেডি, ডিএমকে, আম আদমি পার্টি (আপ), এনসিপি (শরদ গোষ্ঠী)সহ একাধিক বিরোধী দল বৈঠকে বসে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করে। পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নেতারা জানান, তারা সংবিধান ও আইন অনুযায়ী সব সম্ভাব্য পথই অনুসরণ করবেন, তবে নির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ এখনই প্রকাশ করা হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা ও আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি বলেন, “স্পিকার ও চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাতে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সংবিধান অনুযায়ী যে পথগুলো খোলা আছে, সেগুলোই আমরা বিবেচনা করছি।”

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়েন ও সাগরিকা ঘোষ, আরজেডির মনোজ ঝা, ডিএমকের প্রতিনিধি, আপের সন্দীপ পাঠক, এনসিপি (শরদ) শিবিরের রাজীব ঝা এবং অন্যান্য বিরোধী নেতারা। তাঁরা জানান, এই উদ্যোগটি কার্যত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সম্মিলিত অবস্থান।

অভিশংসন প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সংঘাত

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের সাংবিধানিক একমাত্র পথ হলো সংসদে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) প্রস্তাব। নিয়ম অনুযায়ী লোকসভায় অন্তত ১০০ জন এবং রাজ্যসভায় ৫০ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী, তারা মোট ১৯৩ জন সংসদ সদস্যের স্বাক্ষরসহ প্রস্তাব জমা দিয়েছিল—লোকসভায় ১৩৩ জন এবং রাজ্যসভায় ৬০ জন।

তবে দুই কক্ষের শীর্ষ কর্তৃপক্ষই একই দিনে সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেন এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা বা তদন্তের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।

লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা নোটিশ খারিজের কারণ ব্যাখ্যা করেননি। অন্যদিকে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান জানান, সিইসির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বর্তমানে আদালতের বিবেচনাধীন, তাই সংসদীয় প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

এই যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে বিরোধীরা বলছে, অভিযোগগুলো বিচারাধীন কোনো মামলার অংশ নয়, বরং সাংবিধানিক জবাবদিহির বিষয়। সিংভির ভাষায়, “এসআইআর সংক্রান্ত মামলা চলমান থাকতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে অভিশংসন প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।”

বিরোধীদের অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

বিরোধীদের মূল অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ক্ষমতাসীন দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন এবং সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখছেন না। তাদের দাবি, এই পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য হুমকিস্বরূপ।

বিরোধী নেতারা অভিযোগ করেন, স্পিকার ও চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তে বিচারিক প্রক্রিয়ার মতো ধাপগুলো অনুসরণ না করে শুরুতেই নোটিশ বাতিল করা হয়েছে, যা সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট করে।

সিংভি বলেন, “অভিশংসন প্রক্রিয়ায় মোট ছয়টি ধাপ রয়েছে—প্রস্তাব গ্রহণ, তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযোগ নির্ধারণ, তদন্ত প্রতিবেদন, সংসদীয় বিতর্ক এবং শেষে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখানে প্রথম ধাপেই প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা সাংবিধানিক কাঠামোর পরিপন্থী।”

তিনি আরও বলেন, “এখন অধ্যক্ষরাই যেন বিচারক হয়ে গেছেন।”

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উত্তেজনা

এই সিদ্ধান্ত এমন সময় এসেছে যখন একাধিক রাজ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে এবং সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকার ১৬ এপ্রিল থেকে তিন দিনের বিশেষ অধিবেশন ডেকেছে, যেখানে নারী সংরক্ষণ আইন সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

বিরোধীরা মনে করছে, এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই সিইসির বিরুদ্ধে পদক্ষেপকে গুরুত্ব না দিয়ে দ্রুত খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।

ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব সংসদে জমা পড়ল। ফলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পরবর্তী পদক্ষেপ

বিরোধী জোট এখন আদালতের মাধ্যমে স্পিকার ও চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে তারা কোন আদালতে বা কোন আইনি ভিত্তিতে যাবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের সংসদীয় রাজনীতি নতুন এক সংঘাতপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা, যেখানে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স