ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হলেও এতে সরাসরি অংশ না নিয়েও গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়; বরং এটি বৈশ্বিক জোট, অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump–এর নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এবং কঠোর পররাষ্ট্রনীতির ফলে মিত্রদেশগুলোর সামনে তৈরি হয়েছে এক জটিল দ্বিমুখী পরিস্থিতি। একদিকে ওয়াশিংটনের চাপ, অন্যদিকে নিজ নিজ দেশের জনমত—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছেন বিশ্বনেতারা।
‘আমাদের যুদ্ধ নয়’, তবু কেন চাপ?
যেসব দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, তারাও এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তাদের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করা অনেক নেতার জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে মিত্রদের দূরত্ব বাড়ছে
ইতালির প্রধানমন্ত্রী Giorgia Meloni, যিনি একসময় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অবস্থান বদলেছেন। বিশেষ করে পোপ Pope Leo XIV–কে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে তিনি “অগ্রহণযোগ্য” বলে আখ্যা দেন।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী Keir Starmer প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে ব্রিটিশদের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেছে, যা তাঁর সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান পরিবর্তন শুধু কূটনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে নয়; বরং যুদ্ধের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব এবং জনমতের চাপ এর পেছনে বড় কারণ।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কার আশঙ্কা
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই সংঘাতের প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছে International Monetary Fund। সংস্থাটি জানিয়েছে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ২.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ায় তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী Sanae Takaichi–এর সরকারও এই সংকটের চাপ অনুভব করছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় দেশটির মজুরি বৃদ্ধি পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা
যুদ্ধের প্রভাব শুধু অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অনেক নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। ভোটারদের বড় একটি অংশ এই যুদ্ধকে অপ্রয়োজনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছে, ফলে যুদ্ধে সমর্থন দেওয়া রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে নেতারা একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ, অন্যদিকে নিজেদের জনগণের অসন্তোষ—এই দুইয়ের মধ্যে আটকে পড়েছেন।
ন্যাটো ও পশ্চিমা জোটে ফাটল?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের সম্পর্কের এই টানাপোড়েন পশ্চিমা জোট, বিশেষ করে NATO–এর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের একতরফা পররাষ্ট্রনীতি এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার কৌশল ঐতিহ্যগত জোট ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ট্রাম্প ন্যাটোকে একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখেন—এমন ধারণা এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
ইউরোপে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিতেও প্রভাব
ইউরোপের রাজনীতিতেও এই যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হাঙ্গেরির নেতা Viktor Orbán, যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, সাম্প্রতিক নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের প্রতি অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা এখন ইউরোপীয় নেতাদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠছে। ফলে অনেকেই ধীরে ধীরে তাঁর থেকে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করেছেন।
সামনের দিনগুলোতে কী?
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, জোট রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিত্রদেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিয়েও তারা কতটা নিরাপদ থাকতে পারবে, এবং কতদিন পর্যন্ত এই দ্বিমুখী চাপ সামাল দিতে পারবে।