মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে অঞ্চলটিতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump–এর প্রশাসন ইরানকে একটি সমঝোতা চুক্তিতে আনতে চাপ প্রয়োগের কৌশলের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম The Washington Post।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন করে সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজনে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে ইরানে পুনরায় হামলা কিংবা স্থল অভিযান চালানোর সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে একাধিক বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য দিয়েছেন।
বিমানবাহী রণতরি ও হাজারো সেনা মোতায়েন
নতুন মোতায়েনের আওতায় থাকা সেনাদের মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী রণতরি USS George H.W. Bush–এ অবস্থানরত প্রায় ৬ হাজার সেনা, যেটি বর্তমানে কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ দ্বারা সুরক্ষিত।
এ ছাড়া বক্সার অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ এবং US Marine Corps–এর ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের প্রায় ৪ হাজার ২০০ সদস্যও এই অভিযানে যুক্ত হচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁরা চলতি মাসের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবেন।
নতুন বাহিনী আগে থেকেই অঞ্চলটিতে অবস্থানরত মার্কিন নৌ ও বিমান শক্তির সঙ্গে যুক্ত হবে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক অভিযানে নিয়োজিত রয়েছে।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা ও কূটনৈতিক চাপ
মার্কিন প্রশাসন একই সঙ্গে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। রোববার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বন্দর ব্যবহারকারী নৌযানের ওপর অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট Strait of Hormuz–এ চাপ সৃষ্টি করতে চায় ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance–এর নেতৃত্বে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে আলোচনা চললেও সর্বশেষ দফা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে নতুন দফার আলোচনা শিগগিরই শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত “খুব দ্রুত” শেষ হতে পারে এবং সমঝোতা হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গ্যাসের দামও কমে আসবে।
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও সামরিক চাপের জবাবে ইরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি বলেছেন, অবরোধ অব্যাহত থাকলে ইরান পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং লোহিত সাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরান তার “জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত”।
সামরিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল James Foggo বলেন, অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়াবে এবং কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিকল্প সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, “আপনার কাছে যত বেশি টুল থাকবে, আপনার তত বেশি বিকল্প থাকবে।” তাঁর মতে, এই পদক্ষেপ পরিস্থিতি খারাপ হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘অতিরিক্ত সক্ষমতা’ তৈরি করবে।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি Karoline Leavitt বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে “সব বিকল্প খোলা রেখেছেন”।
তিনি দাবি করেন, চাপ ও অবরোধ ইরানকে আলোচনায় আরও আগ্রহী করবে এবং একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তির দিকে ঠেলে দেবে।
তবে পেন্টাগন এবং United States Central Command এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য
নতুন মোতায়েন কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বিমানবাহী রণতরি একসঙ্গে অবস্থান করবে বলে জানা গেছে, যা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখযোগ্য শক্তি বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।