দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলতি বছরের মধ্যেই ‘মিড-ডে মিল’ বা বিদ্যালয়ভিত্তিক খাবার কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূর করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং শিক্ষার প্রতি মনোযোগ ধরে রাখতে সরকার এ কর্মসূচির পরিধি দ্রুত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত ন্যাশনাল বাংলা উচ্চবিদ্যালয়–এ ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট (বালক–বালিকা) ২০২৬’-এর জাতীয় পর্যায়ের খেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।
পুষ্টিহীনতা মোকাবিলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের পুষ্টিহীনতা এবং ক্ষুধাকে প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচনা করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করা হয়। বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলায় ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় খাবার পাচ্ছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ঝরে পড়ার হার কমানো এবং শ্রেণিকক্ষে তাদের মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যতালিকায় রয়েছে বানরুটি, সেদ্ধ ডিম, কলা, ইউএইচটি দুধ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ ফর্টিফায়েড বিস্কুট। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিম্নমানের বানরুটি, পচা বা কাঁচা কলা এবং নষ্ট সেদ্ধ ডিম বিতরণের অভিযোগ উঠে। এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে।
বিস্তৃত হচ্ছে কর্মসূচির পরিধি
এর আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিস্কুটভিত্তিক স্কুল ফিডিং কার্যক্রম পরিচালিত হলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের গরম খাবার, বিশেষ করে খিচুড়ি সরবরাহের বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত নতুন খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা হয়।
সরকার আগামী অর্থবছর থেকে আরও ৩৪৮টি উপজেলায় এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সব বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালুর লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, শিশুরা যেন পুষ্টিহীনতায় না ভোগে এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে পাঠ গ্রহণ করতে পারে, সে লক্ষ্যেই মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে এ বছরের মধ্যেই দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালু করার। পাশাপাশি দেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য স্কুল ড্রেস প্রদানের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।”
মন্ত্রী আরও জানান, শিশুদের জন্য আনন্দময় ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’কে গুরুত্ব
আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের শিক্ষা ও বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেই লক্ষ্যে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষার ধারণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে খেলাধুলাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তা পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই শিশুরা ক্রীড়ামোদী হয়ে উঠুক। খেলাধুলার মাধ্যমে তারা শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দলগত কাজ ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করবে। সেই লক্ষ্যেই প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছে।”
‘তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ববি হাজ্জাজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তোমাদের প্রয়োজন, সম্ভাবনা ও বিকাশের বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তোমাদের জন্য একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।”
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সরকার ক্রীড়া খাতকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চায় যাতে খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতে পেশা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা দক্ষ মানবসম্পদ এবং রাষ্ট্রের যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।”
গোল্ডকাপ ফুটবলে অংশ নিয়েছে ২২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী
মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মো. সাখাওয়াৎ হোসেন–এর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী।
চলতি বছরের ৬ এপ্রিল ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়।
বালক বিভাগে ৬৫ হাজার ৩৪২টি দলের হয়ে ১১ লাখ ১০ হাজার ৮১৪ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করে। অন্যদিকে বালিকা বিভাগে ৬৫ হাজার ৩২১টি দলের হয়ে অংশ নেয় ১১ লাখ ৩ হাজার ২৯১ জন খেলোয়াড়। সব মিলিয়ে ২২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে।
ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায় থেকে শুরু হয়ে উপজেলা বা থানা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শেষে গত ২৩ মে প্রাথমিক পর্বের খেলা সমাপ্ত হয়। বৃহস্পতিবার জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় দেশের আটটি বিভাগের বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন আটটি বালক ও আটটি বালিকা দল অংশ নেয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত পর্ব।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একদিকে বিদ্যালয়ভিত্তিক পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং অন্যদিকে খেলাধুলাকে শিক্ষার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়ন, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যালয়মুখী পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।