ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ‘ভাইরাল’ বা ব্যাপক আলোচনার ওপর নির্ভর করে বলে মন্তব্য করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তাঁর মতে, কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় না হলে বা জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি না করলে রাজনৈতিক মহল ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না—এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র–এ অনুষ্ঠিত ‘আর না ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, বিচারহীনতা: কোন পথে সমাধান?’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন। নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী নাগরিক উদ্যোগ ‘আর না+’ এ আয়োজন করে।
‘প্রতিটি ঘটনার যন্ত্রণা সমান, কিন্তু সব ঘটনা সমান গুরুত্ব পায় না’
রুমিন ফারহানা বলেন, দেশে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে যেখানে ১০০টি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটি ঘটনা অতিরিক্ত গুরুত্ব পায়, বাকিগুলো আলোচনার বাইরে থেকে যায়। তাঁর ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘চেরি-পিকিং’, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা বেছে নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা করা হয় এবং বাকি ঘটনাগুলো আড়ালে চলে যায়।
তিনি বলেন, “প্রতিটি ঘটনার যন্ত্রণা, কষ্ট ও প্রভাব সমান। কিন্তু কোনো কোনো ঘটনা অতিরিক্ত আলোচিত হয় এবং সেটিকে কেন্দ্র করে রাজনীতি শুরু হয়।”
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাকে তিনি ‘ক্লাসিক এক্সাম্পল অব পলিটিসিসাইজেশন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ওই ঘটনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া অতিরিক্ত মাত্রায় কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, যা অন্য সমান গুরুতর ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
পরিসংখ্যান ও বিচারহীনতার প্রশ্ন
আলোচনায় রুমিন ফারহানা বলেন, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক মাসে অন্তত ১১৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার বেশির ভাগই শিশুদের সঙ্গে সম্পর্কিত। অথচ এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি ঘটনা জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়।
তিনি বলেন, “যে ঘটনা ভাইরাল হয়, সেটি ঘিরেই সব রাজনৈতিক মনোযোগ তৈরি হয়। কিন্তু অন্য ঘটনাগুলোর কোনো আলোচনাই থাকে না।”
তাঁর মতে, এই প্রবণতা বিচারপ্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করছে। রাজনৈতিক রং দেওয়া বা দলীয় অবস্থান থেকে বিচার করার প্রবণতা থাকলে আইনের শাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্রুত বিচার নিয়ে উদ্বেগ ও সামাজিক চাপ
আলোচনায় অংশ নেওয়া আইনজীবী আয়েশা আক্তার বলেন, আবেগ বা জনমতের চাপে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে তা অনেক সময় বিচার ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
অন্যদিকে আইনজীবী মানজুর আল মতিন বলেন, “ভাইরাল না হলে কিছু হয় না”—এমন বাস্তবতা গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত গুরুত্ব অনুযায়ী ঘটনাগুলো তুলে ধরা, শুধু আলোচনার ঢেউয়ের পেছনে না ছোটা।
তিনি আরও বলেন, যৌন সহিংসতার যেকোনো ঘটনায় ভুক্তভোগীর পক্ষে সমাজের খোলাখুলি কথা বলা জরুরি, যাতে বিচারপ্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়।
রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও তথ্য ব্যবস্থার দাবি
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাসনিম জারা বলেন, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা যেন আলোচনার ‘ভাইরালিটি’র ওপর নির্ভর না করে, সে জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী তথ্য ও মনিটরিং কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এসব ঘটনার বিচার কোন পর্যায়ে আছে—এ বিষয়ে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছানো দরকার।
রাজনৈতিক ব্যবহার ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, অনেক সময় ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনাকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, এই সমস্যা সমাধানে শুধু আইন নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান
আলোচনায় সাবেক ছাত্রনেতা উমামা ফাতেমা বলেন, শুধু নতুন আইন করলেই সহিংসতা বন্ধ হবে না; সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধাগুলোও দূর করতে হবে।
অন্যদিকে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত বলেন, ধর্ষণ–নির্যাতনের মতো গভীর সামাজিক সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে এবং নাগরিক পর্যায়েও ধারাবাহিক চাপ বজায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, “এই সমস্যার সমাধান এককভাবে কারও পক্ষে সম্ভব নয়।”
গণবিপ্লবী উদ্যোগের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি, যা ধর্মীয় ও সামাজিক সব প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করবে।
বহুমাত্রিক আলোচনায় বিচারব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন বক্তার মতে, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করতে শুধু আইন নয়, সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা একসঙ্গে প্রয়োজন। একই সঙ্গে ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’র ওপর নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিটি ঘটনার জন্য সমান গুরুত্ব ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি উঠে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আলোচনাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চাপ তৈরি করলেও বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা।