বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে ‘গণবিরোধী’ ও ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে সরকারের এ পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি অবিলম্বে বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরীতে প্রতিবাদী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকায় বিকেল ৫টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ–এর উত্তর গেটে কেন্দ্রীয়ভাবে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে।
বিদ্যুৎ দাম বৃদ্ধির ঘোষণা ও প্রভাব
গত বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করে। ঘোষণায় পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী—
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রায় ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি
সঞ্চালন চার্জ প্রায় ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি
গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে প্রায় ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি
নতুন এই মূল্যহার জুন মাস থেকে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প—সব শ্রেণির গ্রাহকের ওপরই বাড়তি চাপ পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি ‘তাড়াহুড়া করে’ ও জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে নেওয়া হয়েছে।
দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারের এ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়াবে।
তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর ওপর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে।
অর্থনীতি ও শিল্প খাতে প্রভাবের আশঙ্কা
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা শিল্প ও কৃষি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তার মতে, কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি উৎপাদনে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
দুর্নীতি ও ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে অভিযোগ
জামায়াত নেতা আরও দাবি করেন, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, অপচয় এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ লুটপাটের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, “বিদ্যুৎ খাতের সীমাহীন দুর্নীতি ও অপচয়ের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি বলেন, জনগণের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতো না।
মূল্য প্রত্যাহারের দাবি
বিবৃতিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জনস্বার্থ বিবেচনায় সরকারকে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা
বিবৃতিতে জানানো হয়, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার দেশের সব মহানগরীতে বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
এর অংশ হিসেবে ঢাকায় কেন্দ্রীয় বিক্ষোভ হবে বিকেল ৫টায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে। দলটির নেতারা এতে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপট
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এ সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থবিরোধী হিসেবে সমালোচনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চাপ এবং ভর্তুকি সমন্বয়ের বাস্তবতা থাকলেও, এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই গুরুত্ব পাচ্ছে।