ইংল্যান্ডের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৪ বছর বয়স (নবম শ্রেণি) থেকেই শিক্ষার্থীরা গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো বাধ্যতামূলক বিষয়ের পাশাপাশি উৎপাদনশিল্প (ম্যানুফ্যাকচারিং), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নির্মাণ, কোডিং, সাইবার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাবে।
সরকারের ভাষ্য, নতুন এই শিক্ষা কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া এবং স্থানীয় শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সরাসরি সংযোগ তৈরি করা। এ লক্ষ্যে নতুন কোর্সগুলো স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা বিবেচনায় তৈরি করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য কর্ম-অভিজ্ঞতা (ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স) অর্জনের সুযোগও রাখা হবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় ‘মৌলিক পরিবর্তন’
সরকার এই উদ্যোগকে ইংল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ‘মৌলিক পরিবর্তন’ হিসেবে বর্ণনা করছে। যদিও নতুন কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি।
টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ব্যবহারিক ও কারিগরি দক্ষতার গুরুত্ব কমেনি; বরং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের ব্রিটেনে দক্ষ প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, উৎপাদন বিশেষজ্ঞ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চাহিদা আরও বাড়বে। অতীতে কারিগরি শিক্ষা মূলধারার পাঠ্যক্রমের বাইরে থাকলেও নতুন পরিকল্পনায় সেটিকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশে নিয়ে আসা হবে।
একাডেমিক ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বয়
নতুন পরিকল্পনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, শিক্ষার্থীদের আর একাডেমিক ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে না। তারা বাধ্যতামূলক বিষয়গুলোর পাশাপাশি নিজেদের আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পেশাগত লক্ষ্য অনুযায়ী কারিগরি বিষয়ও নির্বাচন করতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যামের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে শুধু একাডেমিক শিক্ষাতেই ভালো করতে হবে। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় নির্মাণ, কোডিং, ধ্রুপদি শিক্ষা, গণিত, উৎপাদনশিল্প কিংবা যন্ত্রপ্রকৌশল—যে ক্ষেত্রই বেছে নেওয়া হোক না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
যুব বেকারত্ব কমানোর লক্ষ্য
সরকার বলছে, এই সংস্কারের লক্ষ্য শুধু শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং যুক্তরাজ্যে ক্রমবর্ধমান যুব বেকারত্ব মোকাবিলা করাও।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ১০ লাখের বেশি তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। গত ১২ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। সরকারের ধারণা, আধুনিক কারিগরি শিক্ষা, শিল্পখাতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এবং কর্ম-অভিজ্ঞতার সুযোগ বাড়ানো গেলে এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হবে।
২০২৮ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, সরকারের লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের কয়েকটি অঞ্চলে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা।
এর অংশ হিসেবে বিদ্যালয় মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হবে। শিক্ষা তদারকি সংস্থা অফস্টেড ভবিষ্যতে বিদ্যালয় মূল্যায়নের সময় কারিগরি শিক্ষার মানকেও গুরুত্ব দেবে। তবে বর্তমান জিসিএসই (GCSE) মূল্যায়ন কাঠামোর সঙ্গে এই নতুন ব্যবস্থার সমন্বয় কীভাবে হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
শুধু ইংল্যান্ডে কার্যকর হবে
এই সংস্কার কেবল ইংল্যান্ডে কার্যকর হবে। কারণ, যুক্তরাজ্যে শিক্ষা একটি বিকেন্দ্রীভূত নীতিগত বিষয় এবং ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব শিক্ষা নীতি রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডেও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সংযোগ জোরদারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এটি গ্রেটার ম্যানচেস্টারে চালু হওয়া Greater Manchester Baccalaureate (MBacc) কর্মসূচির অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে। ওই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা স্থানীয় শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী একাডেমিক ও কারিগরি বিষয় বেছে নেওয়ার পাশাপাশি ক্যারিয়ার পরামর্শ ও কর্ম-অভিজ্ঞতার সুযোগ পেয়ে থাকে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল বলেন, নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মেয়র এবং স্থানীয় পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যা তরুণদের নিজ নিজ এলাকার কর্মসংস্থানের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করবে।
তিনি বলেন, চলমান প্রযুক্তিগত বিপ্লবের বাস্তবতায় দেশের অর্থনীতির জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমর্থনের পাশাপাশি উদ্বেগও
সাবেক মন্ত্রী অ্যালান মিলবার্ন সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণদের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতে ‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাঁর মতে, নতুন এই সংস্কার সেই সংকট মোকাবিলায় সঠিক পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে বিরোধী কনজারভেটিভ দলের শিক্ষাবিষয়ক মুখপাত্র লরা ট্রট মনে করেন, এই উদ্যোগ শ্রমবাজারের বিদ্যমান সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, জ্ঞানভিত্তিক শক্তিশালী একাডেমিক পাঠ্যক্রমের ওপরই প্রধান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের শিক্ষাবিষয়ক মুখপাত্র মুনিরা উইলসন বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী একাডেমিক ও কারিগরি ধারার মধ্যে পরিবর্তনের সুযোগ থাকা উচিত। তাঁর মতে, মাত্র ১৪ বছর বয়সে কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ শিক্ষার পথ নির্ধারণ করে দেওয়া সমীচীন হবে না।
এদিকে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হেড টিচার্সের মহাসচিব পল হোয়াইটম্যান বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও এটি বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন, অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা নিয়ে সরকারের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।