ঢাকা

ভারতে গ্রেপ্তার অভিযান ঘিরে উত্তেজনা, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ‘তেলাপোকাদের’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতে জেন–জি প্রজন্মের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আবারও রাজপথে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আন্দোলন স্থগিতের পর গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি না দিলে নতুন করে দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

সিজেপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি না দিলে সরকারকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করেছে সংগঠনটি।

সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহের টানা আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে এটি ছিল কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দ্বিতীয় পদত্যাগ। ফলে ঘটনাটি মোদি সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ থেকে শুরু আন্দোলন

ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর আন্দোলনে নামে সিজেপি। সংগঠনটি অভিযোগ করে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ ঘটনায় সরকারের জবাবদিহি এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়।

বিক্ষোভে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন। পরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। সিজেপি, যারা দেশটিতে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘তেলাপোকা’ নামে পরিচিত, সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।

আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর সিজেপি বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করে। তবে সংগঠনটির অভিযোগ, আন্দোলন স্থগিতের পরও দেশজুড়ে ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, সরকার আশ্বাস দিয়েছিল যে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কারও বিরুদ্ধে এখন বা ভবিষ্যতে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই শনিবার দেশব্যাপী কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

সরকারকে সতর্ক করল সিজেপি

গত সোমবার সিজেপি মোদি সরকারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার আহ্বান জানায়। সংগঠনটির দাবি, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে এখনো অনেক শিক্ষার্থী আটক রয়েছেন।

সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, “সরকার যদি চুক্তিকে সম্মান না করে এবং আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি না দেয়, তাহলে আমরা আবারও আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।”

যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইএসএ) সদস্যরাও একই দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বিহারের পুলিশ প্রধানের সঙ্গে দেখা করে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি জানান।

কয়েকটি রাজ্যে মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা

বিহার পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। স্থানীয় সময় রোববার সন্ধ্যা ৬টার আগে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে বলেও জানিয়েছে তারা।

আইএসএ জানিয়েছে, আসাম সরকারও আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার করেছে এবং আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়েছে।

তবে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে মামলা দায়ের হয়েছে। শুক্রবারের এক সমাবেশে ‘আপত্তিকর পোস্টার’ প্রদর্শনের অভিযোগে রাজ্য পুলিশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ওই সমাবেশে হাজারো মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগই মুসলিম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি

বিক্ষোভের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সক্রিয় ছিলেন আন্দোলনকারীরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মিম ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে।

তবে কয়েকজন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী অভিযোগ করেছেন, সরকারবিরোধী সমালোচনামূলক পোস্ট দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দিল্লি পুলিশও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্ল্যাটফর্মকে ‘আপত্তিকর ভাষা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য’ থাকা পোস্ট সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কনটেন্ট শনাক্তের কাজ চলছে।

আইনি সহায়তায় তহবিল গঠন

সিজেপি জানিয়েছে, ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত আন্দোলনকারীদের আইনি সহায়তা দিতে একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে তাঁরা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

বিচার বিভাগের সমালোচনা

গত মে মাসে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। ২০ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের অভিযোগ ওঠার পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।

ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, দেশটির সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং বিক্ষোভ দমনের অভিযোগ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন মোদি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি ও সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে আন্দোলন আবারও বড় আকার নেয় কি না।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স