ঢাকা

ইরাকে ২০ জন নিহতের পর উদ্বেগ, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি হামলা ঘিরে যুদ্ধের আশঙ্কা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরাকে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)–এর একাধিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ হামলায় অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে।

পরস্পরবিরোধী এসব সামরিক পদক্ষেপের পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও নতুন করে জোরদার হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ দিনের বোমা হামলার পর গত শুক্রবার হামলা স্থগিত করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর ইরানও পাল্টা হামলা সাময়িকভাবে বন্ধের কথা জানিয়েছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে ইরাক ও জর্ডানে হামলার ঘটনা ঘটল।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর এবারই প্রথম প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সৌদি আরব।

পিএমএফের ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি হামলা

বুধবার ভোরে ইরাকের বিভিন্ন এলাকায় পিএমএফের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব।

ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দাবি, ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানোর জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

পিএমএফ জানিয়েছে, বাগদাদ, নিনেভে, বসরা, কিরকুক, কারবালা, দিয়ালা ও ওয়াসিত প্রদেশে তাদের স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ২০ জন সদস্য নিহত এবং ৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।

হামলার পর ইরাক সরকার জরুরি বৈঠক করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলী আল–জাইদি জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক ডাকেন।

ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি দেশের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তাঁর মতে, ইরাকের ভূখণ্ড কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর ক্ষেত্র বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সংঘাতের ময়দান হতে পারে না।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি যৌথ হামলার কয়েক ঘণ্টার আগে জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা হয়েছে।

জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা পাঁচটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।

অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি ট্যাংকারেও হামলার দাবি করেছে তারা।

তবে আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি হামলা এবং জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলার মধ্যে কোনটি আগে ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, জর্ডানে প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর দেশটির মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী সেনাদের মুঠোফোন ব্যবহারে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সেনাদের ধারণ করা ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে ইরান হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করতে সুবিধা পেতে পারে।

ট্রাম্পের পাল্টা হুমকি

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে এ হামলার জন্য ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে।

তিনি দাবি করেন, ইরানের আকস্মিক হামলার জবাব দেওয়ার জন্য মার্কিন বাহিনীর হাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল। তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরাকে ইরান–সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ অভিযান ইরাকি সরকারের সমন্বয়েই পরিচালিত হয়েছে।

তিনি এসব গোষ্ঠীকে ‘বিশ্বের জন্য ক্যানসার’ হিসেবে উল্লেখ করে ইরান–সমর্থিত অন্যান্য সংগঠনের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।

যুদ্ধ বিস্তারের আশঙ্কা

নতুন করে সামরিক উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনার জন্য ওমানের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, ওই প্রস্তাব তাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আল–জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলমান সংঘাত এখন লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো উভয় পক্ষকে উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।

ভেঙে পড়ছে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে পূর্বের সমঝোতার প্রতিশ্রুতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে দুই পক্ষের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছিল।

তবে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় সেই উদ্যোগ কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামনের দিনগুলোতে একদিকে যেমন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমিত আকারের সামরিক পাল্টাপাল্টি অভিযান অব্যাহত থাকার ঝুঁকিও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন নির্ভর করছে দুই পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স