যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কূটনৈতিক আলোচনার চেয়ে অবিশ্বাসই বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। পরমাণু কর্মসূচি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেই দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতবিরোধ বিদ্যমান।
একাধিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই অবিশ্বাসই সম্ভাব্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
ভাঙা চুক্তির ইতিহাস ও আস্থাহীনতার সূচনা
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালে সম্পাদিত বহুল আলোচিত ইরান পরমাণু চুক্তি বাতিল করে দেন তাঁর প্রথম মেয়াদে। ওই চুক্তি কয়েক বছরের দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তির সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং এতে ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই চুক্তিকে “অকার্যকর” আখ্যা দিয়ে একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। ইরান পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুতর আঘাত আসে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়।
আলোচনার আড়ালে সামরিক উত্তেজনা
রিপোর্ট অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই প্রক্রিয়ায়ও আস্থা গড়ে ওঠেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক পর্যায়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পরপরই হামলা চালানো হয়, যা ইরানের দৃষ্টিতে কূটনৈতিক বিশ্বাসকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে সামরিক উত্তেজনা ও হামলার ঘটনা ঘটে।
ইরানি পক্ষ মনে করে, আলোচনার আড়ালে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ সংলাপকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পারস্পরিক সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দু: পরমাণু কর্মসূচি
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের মূল সংকট হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান তাদের পারমাণবিক প্রকল্প শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালনার দাবি করলেও বাস্তবে সামরিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে।
অন্যদিকে ইরান দাবি করে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ তাদের আত্মরক্ষামূলক অবস্থানকে বাধ্য করেছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক করিম সাদজাদপুর বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিশ্বাস সবসময়ই কম ছিল, কিন্তু এখন কোনো বিশ্বাসই নেই। ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময়, এমনকি আলোচনার মধ্যেও হামলা চালাতে পারে।”
হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
আরেকটি বড় বিতর্কের ক্ষেত্র হলো হরমুজ প্রণালি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানি পক্ষের অভিযোগ, পশ্চিমা দেশগুলোর অবরোধ ও সামরিক চাপ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
বিশ্বাসের সংকট দুই দিকেই
বিশ্লেষকরা বলছেন, অবিশ্বাস কেবল একপাক্ষিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরান বহুবার তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখেনি এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের বিভ্রান্ত করেছে।
অন্যদিকে ইরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ভঙ্গ করে নিজেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।
মার্কিন সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল ডোরান বলেন, ইরানের অতীত আচরণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে এবং তাদের ঘোষণার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখা কঠিন।
‘বিশ্বাস করো, কিন্তু যাচাই করো’—বাস্তবতা কি প্রযোজ্য?
শীতল যুদ্ধকালীন সময়ের একটি বিখ্যাত কূটনৈতিক নীতি ছিল—“বিশ্বাস করো, কিন্তু যাচাই করো।” তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতিও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ পারস্পরিক আস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায়।
নতুন চুক্তি কি সম্ভব?
রবার্ট ম্যালির মতো সাবেক মধ্যস্থতাকারীরা মনে করেন, একটি নতুন চুক্তি করতে হলে উভয় পক্ষকেই কঠিন ছাড় দিতে হবে। ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে হতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে।
তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো—এই ছাড়গুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
সময়সাপেক্ষ ও জটিল কূটনীতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের জটিল চুক্তি করতে মাস নয়, বরং বছর লেগে যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা এবং ইরানের সতর্ক অগ্রগতি—এই দুই বিপরীত কৌশল আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
করিম সাদজাদপুর বলেন, “চুক্তি করতে গেলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, দীর্ঘমেয়াদি আস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। আর সেটাই এখন সবচেয়ে অনুপস্থিত বিষয়।”
ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক সম্পর্ক মূলত এক গভীর আস্থাহীনতার সংকটে আটকে আছে। অতীত চুক্তি ভাঙা, সামরিক উত্তেজনা এবং পারস্পরিক সন্দেহ—সব মিলিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কোনো চুক্তি যদি হয়ও, তা হবে অত্যন্ত জটিল, ধীরগতির এবং কঠোর পর্যবেক্ষণ নির্ভর একটি প্রক্রিয়া—যার ভবিষ্যৎ এখনো অস্পষ্ট।