নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসের মধ্যে প্রায় তিন মাসই কেটেছে জ্বালানি খাতের নানা সংকট মোকাবিলায়। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এরপর প্রায় এক মাস ধরে দেশে তীব্র গ্যাসসংকট চলছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও, বেড়েছে লোডশেডিং।
সরকার সংকট সামাল দিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়নের মধ্যে দীর্ঘ সময় চলে যাচ্ছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান সংকটের মূল দায় বর্তমান সরকারের নয়। গত দেড় দশকে জ্বালানি খাতের নানা দুর্বলতা ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহেও বড় ধাক্কা আসে।
তবে সংকটের পুরোনো কারণ থাকলেও তা মোকাবিলায় সরকারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল, সেগুলোর বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত গতি দেখা যায়নি।
তেলের সংকটে সিদ্ধান্তের উল্টো ফল
গত মার্চে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। মাসের প্রথম চার দিনেই স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ তেল বিক্রি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করলে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়ে। দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও তেলের সরবরাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো হয়নি। ফলে সরকারের একাধিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে মানুষের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রায় দুই মাস ধরে দিন-রাত ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় ছিল।
এপ্রিলের শেষ দিকে জ্বালানি তেলের দাম বড় আকারে বাড়ানো, ফুয়েল পাস চালু এবং বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি—এই তিন পদক্ষেপের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
এই অভিজ্ঞতার পর দেশে জ্বালানি তেলের মজুত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো নিয়মিত আমদানির ওপরই দেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ অনেকটা নির্ভরশীল। এর মধ্যে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে বিভিন্ন কোম্পানিকে তেল সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তেল সরবরাহ করতে না পারলেও দ্বিতীয় দফায় আবার কিছু কোম্পানিকে একই ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এভাবে আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকায় কোনো কারণে বিদেশ থেকে তেল আসা ব্যাহত হলে দেশে আবারও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুরোনো পরিশোধনাগার, নতুন প্রকল্পে ধীরগতি
বাংলাদেশে সরকারি মালিকানাধীন একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারটি স্বাধীনতার আগের সময়ের। ২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বছরে ৩০ লাখ টন পরিশোধনক্ষমতার নতুন একটি রিফাইনারি তৈরির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও প্রকল্পটির বাস্তব কাজ শুরু হয়নি।
পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি এস আলম গ্রুপকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটি অনুমোদনও পায়। বর্তমান সরকার প্রকল্পটি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে বাস্তব অগ্রগতিও হয়নি।
অন্যদিকে, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বিশেষ বিধান আইন করেছিল। পরে আইনটি ‘দায়মুক্তি আইন’ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়। এই আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়া একাধিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তি করা হয়।
প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত না করেই অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এসব কেন্দ্রের গড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত থাকে। তারপরও কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি বছরের পর বছর বেড়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বড় আর্থিক দায়
ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের বকেয়া রেখে যায় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালে গ্যাস খাতে প্রায় ৭৫ কোটি ডলার এবং জ্বালানি তেল খাতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বকেয়া ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ধাপে ধাপে এসব দেনা পরিশোধ করে।
বর্তমান সরকার নতুন করে বড় অঙ্কের বকেয়া তৈরি না করলেও দুই খাতেই ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি লোকসানের মুখে রয়েছে। দেশে জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানে উচ্চ পর্যায়ে থাকার পরও লোকসান সামাল দিতে এক যুগের বেশি সময় পর সরকারের কাছে ভর্তুকি চেয়েছে সংস্থাটি।
বিদ্যুৎ খাতেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু নিয়মিত বিল পরিশোধ না হওয়ায় কেন্দ্রগুলোর পাওনা বেড়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে এই বকেয়া আরও বাড়ে। পরে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আগের বকেয়াসহ নিয়মিত বিল পরিশোধ করা হয়। এতে কিছুটা কমলেও গত বছরের আগস্ট থেকে আবার বকেয়া বাড়তে শুরু করে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার সময় বকেয়া ছিল প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি তেল বিক্রিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার পরিকল্পনা
সরকার জ্বালানি তেল বাজারজাতকরণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার কথা ভাবছে। বর্তমানে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এই তিন সরকারি কোম্পানি তাদের ডিলারদের মাধ্যমে দেশে তেল বিক্রি করে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই ব্যবসায় প্রবেশের সুযোগ দিতে একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। নীতিমালা কার্যকর হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের মতো পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে নিজেদের ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারবে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশ এ উদ্যোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং ভোক্তাদের বেশি দামে তেল কিনতে হতে পারে। এলপিজির বাজারে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর আধিপত্যের উদাহরণও তাঁরা সামনে আনছেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রয়োজনীয় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান, আগের তুলনায় দ্বিগুণ সক্ষমতার রিফাইনারি নির্মাণ এবং নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি বাজারে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে ছিল না।
দরপত্র ছাড়া কেনাকাটা নিয়ে প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ বিধান আইনটি বাতিল করলেও বর্তমান সরকারের সময়েও দরপত্র ছাড়া কিছু চুক্তি করার প্রবণতা দেখা গেছে। সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি ব্যবস্থায় কম দামে জ্বালানি কেনার জন্য চুক্তি করা হয়েছে।
তবে দরপত্র ছাড়া জ্বালানি তেল ও এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে সময়মতো সরবরাহ পাওয়া যায়নি। এলএনজি কার্গো না আসায় দেশে গ্যাসসংকট আরও বেড়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশেষ পরিস্থিতির কারণেই এসব সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং বিদ্যমান সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করেই চুক্তি করা হয়েছে।
গ্যাস উৎপাদন কমছে, চাহিদা বাড়ছে
দেশের গ্যাস খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দেশীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে গ্যাস উৎপাদন কমছে। গত এক দশকে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট কমেছে।
২০১৭ সালে দেশে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো। বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৬৩ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানোর বদলে গত আওয়ামী লীগ সরকার একপর্যায়ে আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। একটি সামিটের এবং অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের। দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
আরও টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও গত দুই বছরে নতুন কোনো টার্মিনাল যুক্ত হয়নি। ফলে প্রয়োজন থাকলেও এলএনজি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ সীমিত।
টার্মিনাল দুর্ঘটনায় গ্যাসসংকট তীব্র
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহের উপযোগী হলেও পর্যাপ্ত এলএনজি না থাকায় পুরো সক্ষমতায় সরবরাহ করতে পারেনি।
এরপর বুধবার বিকেলে এলএনজির অভাবে ওই টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বর্তমানে সামিটের টার্মিনালের ওপরই মূলত নির্ভর করতে হচ্ছে।
নতুন করে দুটি ভাসমান ও একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এর মধ্যে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণে চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এটি জিটুজি ভিত্তিতে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক টার্মিনালের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে এবং পরামর্শক নিয়োগও চূড়ান্ত পর্যায়ে।
গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন
বিশ্বের গড়ের তুলনায় বাংলাদেশে অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা ভালো হলেও দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান হয়নি।
সমুদ্রসীমা বিজয়ের ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও বঙ্গোপসাগরে এখনো বড় কোনো তেল-গ্যাস আবিষ্কার হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি অনুসন্ধানের কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তারা সরে যায়।
স্থলভাগেও অনুসন্ধান কার্যক্রম ছিল সীমিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। বর্তমান সরকার গত মে মাসে আবারও দরপত্র আহ্বান করেছে।
চুক্তি হলেও অনুসন্ধান থেকে গ্যাস উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিক সংকট সমাধানে আমদানির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।
২০২২ সালে ডলার সংকটের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার টানা কয়েক মাস স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রেখেছিল। একই সময়ে অনুসন্ধান, সংস্কার ও উন্নয়ন মিলিয়ে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ হওয়ার কথা ছিল।
পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার এই কর্মসূচির গতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় এবং আরও ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করে। বর্তমান সরকার মোট ১৫০টি কূপের কাজ দ্রুত শেষ করার কথা বলেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে এবং আরও আটটির কাজ চলছে।
২০২৫ সালের মধ্যেই ৫০টি কূপের কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও তা পূরণ হয়নি। গত ছয় মাসেও কার্যক্রমে বড় ধরনের গতি দেখা যায়নি। ভোলায় থাকা অব্যবহৃত গ্যাস কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় এলএনজি ও গ্যাস
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি বিভাগ পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এতে চলতি বছরে ১১৫টি এলএনজি কার্গো আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বিদ্যমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এর চেয়ে বেশি এলএনজি আমদানি করা কঠিন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমদানি বাড়াতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া আগামী সংসদ অধিবেশনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য ১০ বছরের একটি পরিকল্পনা তুলে ধরার কথাও জানিয়েছে সরকার।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন লক্ষ্য
গত দেড় দশকে বিদ্যুতের দাম পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু দাম বাড়ানোর পরও সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ প্রতিবছর বেড়েছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে খরচ কমানোর উদ্যোগ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সব চুক্তি পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে বিভিন্ন চুক্তিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয় চিহ্নিত করা হয়।
এদিকে বর্তমান সরকারও চুক্তি পর্যালোচনার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগে নতুন কমিটি করেছে। তবে এর মধ্যেই গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রায় ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে প্রায় ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অবশ্য সরকার নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানিতে চলতি বাজেটে একাধিক শুল্ক ও কর সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে কিছু শর্ত থাকায় এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের প্রভাব
গ্যাসসংকট ও বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত এপ্রিল এবং চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত লোডশেডিং হয়েছে। গ্যাসসংকট শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির পাওনা ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে সমস্যায় পড়ছে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বাস্তবে উৎপাদন অনেক সময় ১৪ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
ব্যয়বহুল ও দুর্বল কাঠামোয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে গত দেড় দশকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নানা দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, স্বল্পমেয়াদি ব্যয়বহুল চুক্তি, অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ এবং আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে খাতটি ব্যয়বহুল ও দুর্বল কাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
দলটির পরিকল্পনায় অপ্রয়োজনীয় রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা করে খরচ কমানো, ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং দেশীয় উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে বড় সক্ষমতার নতুন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনাগার নির্মাণ, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, স্থল ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে আরও স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কর সুবিধা এবং কম সুদের অর্থায়নের কথাও বলা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০ তৈরি করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে শুল্ক সুবিধা, নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, রিফাইনারি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমাতেও চুক্তি পর্যালোচনার কাজ চলছে।
তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি, আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাও পরিস্থিতি সামলানোর গতি কমিয়েছে।
তাঁর মতে, আমদানিনির্ভরতা কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর সুফল পেতে সময় লাগবে। তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় আরও দ্রুত ও দক্ষ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সরাসরি বেসরকারীকরণের উদ্যোগও সমস্যার সমাধান না করে বরং ভোক্তার ব্যয় এবং সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে।