চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)–এর উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমেও। ইতিমধ্যে অন্তত ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। বন্ধ রয়েছে ক্লাসও।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে। অন্যদিকে, দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে শিক্ষাজীবন পিছিয়ে যাওসাবেক উপাচার্য আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি যোগাযোগ, তাঁর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ, চুয়েটের বাইরে থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ এবং মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কোনো কারণ প্রকাশ নায়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
ক্ষোভের পেছনে কয়েকটি কারণ
চুয়েটের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করছে।
এর মধ্যে রয়েছে—সাবেক উপাচার্য আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি যোগাযোগ, তাঁর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ, চুয়েটের বাইরে থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ এবং মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কোনো কারণ প্রকাশ না করে আগের উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের আগের দায়িত্বকাল নিয়েও শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রশ্ন রয়েছে।
২১ সেপ্টেম্বর নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর রাতেই শিক্ষার্থীরা মিছিল করে উপাচার্যের বাসভবনে তালা দেন। পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ করে শুরু হয় সর্বাত্মক ‘শাটডাউন’। ছুটির দিনেও অবস্থান কর্মসূচি ও গণস্বাক্ষর সংগ্রহ চলে।
৫৬ দিনের মাথায় পরিবর্তন
গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। পরদিন তিনি দায়িত্ব নেন। কিন্তু মাত্র ৫৬ দিন পর, ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শর বিষয়টিই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন—তাঁর কাজে কোনো সমস্যা থাকলে সেটি তাঁদের জানানো হলো না কেনীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য করা হয়।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ করা হয়নি। আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমও জানিয়েছিলেন, সিদ্ধান্তটির বিষয়ে তাঁকে আগে থেকে জানানো হয়নি।
এ বিষয়টিই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন—তাঁর কাজে কোনো সমস্যা থাকলে সেটি তাঁদের জানানো হলো না কেন।
সাবেক উপাচার্যের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা
আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম নিজেও চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। ২০০৫ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে জাপানের হোক্কাইডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন।
শিক্ষার্থীদের কয়েকজনের ভাষ্য, শিক্ষক হিসেবে তিনি তাঁদের উচ্চশিক্ষা ও বিদেশে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন। নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বৃত্তি পাওয়ার পাশাপাশি ইতালির একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীর চাকরির ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কার্যক্রম জোরদার, গবেষণার সুযোগ বাড়ানো এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। ভাষাশিক্ষা কেন্দ্র ও সমাবর্তন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেছেন।
পুরকৌশল বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষার্থীদের কথা সরাসরি শুনতেন বলেই তাঁর সঙ্গে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের আরেক শিক্ষার্থীর মতে, তিনি কিছু উদ্যোগ শুরু করেছিলেন এবং সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য তাঁকে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আবুল হাসানও মনে করেন, অল্প সময়ের মধ্যে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি শিক্ষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
নতুন উপাচার্যকে নিয়েও প্রশ্ন
নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমও চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশলে স্নাতক হওয়ার পর ইতালিতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
চুয়েটে আসার আগে তিনি কুয়েটের সহ-উপাচার্য ছিলেন। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে কুয়েটে আন্দোলনের মধ্যে তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
এ কারণে চুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, কুয়েটে আন্দোলনের সময় সহ-উপাচার্যের পদ হারানো একজনকে চুয়েটের উপাচার্য করা হলো কেন।
তবে আন্দোলনের শুরুর দিকে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছিলেন, নতুন উপাচার্যের ব্যক্তিগত পরিচয় তাঁদের আপত্তির মূল বিষয় নয়। তাঁদের প্রধান দাবি ছিল, আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে কেন সরানো হলো তার ব্যাখ্যা দেওয়া।
চুয়েটের বাইরে থেকে উপাচার্য নিয়োগ নিয়েও আলোচনা
চুয়েটের ইতিহাসে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা এবার দ্বিতীয়বার ঘটেছে। এর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মীর শহিদুল ইসলাম চুয়েটের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৮টি বিভাগে বর্তমানে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং ৩ শতাধিক শিক্ষক রয়েছেন। উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলতে থাকায় শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নতুন উপাচার্য এখনো ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম দায়িত্ব গ্রহণ করলেও আন্দোলনের কারণে এখনো ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান, ডিন ও বিভিন্ন পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করছেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ব্যাচ ও ক্লাবের প্রতিনিধিরাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে তিনি জানান।
সব পক্ষকে আশ্বস্ত করতে পারলে দ্রুত ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু কাউছার মনে করেন, উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের কাছেও সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাঁর মতে, আগের উপাচার্যের কাজে সমস্যা থাকলে তা জানানো যেত এবং নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার আগে পরিস্থিতি বিবেচনা করা দরকার ছিল।
অন্যদিকে, আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম জানিয়েছেন, আন্দোলনের পেছনে তাঁর কোনো ইন্ধন নেই। শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের কাউকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি বলেননি বলেও দাবি করেছেন।
পরীক্ষা বন্ধ, বাড়ছে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ
আন্দোলনের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরীক্ষা ও ক্লাসে। পুরকৌশল, যন্ত্রকৌশল, পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অন্তত ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে।
একজন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, অনেকের পরীক্ষা ইতিমধ্যে চলছিল। শাটডাউন দীর্ঘ হলে শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্থগিত পরীক্ষার নতুন সময়সূচিও এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আন্দোলন ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
নতুন উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে যাওয়ার আগেই প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা প্রতীকী লাল কার্ড প্রদর্শনও করেছেন।
অন্যদিকে, চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ আন্দোলনের বিরোধিতা করে বলেছেন, নতুন উপাচার্যকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। তিনি আন্দোলনের পেছনে কয়েকটি রাজনৈতিক পক্ষের ইন্ধনের অভিযোগ তুলেছেন। তবে এটি তাঁর নিজস্ব বক্তব্য ও অভিযোগ; এ দাবির স্বাধীন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. তৌফিক হাসান চৌধুরীও বলেছেন, নতুন উপাচার্যের কাজ দেখার আগে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। তাঁর মতে, পরে কোনো অনিয়ম বা ভুল প্রমাণিত হলে তখন আন্দোলনের সুযোগ রয়েছে।
আইনে উপাচার্যকে সরানোর সুযোগ আছে
চুয়েট আইন, ২০০৩ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে চার বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগ করেন। আইনের ১০(২) ধারায় আচার্য প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো সময় কারণ না দেখিয়েও উপাচার্যকে অব্যাহতি দিতে পারেন।
তবে বর্তমান আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—এই আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মধ্যে কেন সরানো হলো এবং এর কারণ প্রকাশ করা হলো না কেন।
চুয়েটের প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মনে করেন, একজন উপাচার্য নিয়োগের দুই মাসের মধ্যেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো কারণ থাকলে সেটি প্রকাশ করা উচিত ছিল। তাঁর মতে, পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার চাইলে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বর্তমানে একদিকে সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে, অন্যদিকে নতুন উপাচার্যকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার পক্ষেও মত রয়েছে। এর মধ্যেই পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর।