গণভোটে জনগণের অংশগ্রহণ ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোটের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের রায়ের পরও সংসদীয় অবস্থান ও রাজনৈতিক বক্তব্যে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া হচ্ছে, যা তিনি “অন্তহীন প্রতারণা” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
রোববার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–এর সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনের সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন তিনি। “জ্বালানি, অর্থনীতি, সংস্কার ও গণভোট বিষয়ক জাতীয় কনভেনশন” শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে মূল আলোচনার বিষয় ছিল ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে জুলাই সনদ, সংস্কার ও গণভোট’।
গণভোট ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অভিযোগ
গোলাম পরওয়ার বলেন, সাম্প্রতিক গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার জুলাই সনদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং বিএনপির দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কার্যত জনগণের রায়ে বাতিল হয়ে গেছে। তিনি দাবি করেন, এই বাস্তবতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে।
তিনি কটাক্ষ করে বলেন, “যারা জনগণকে হ্যাঁ ভোট দিতে বলেছিলেন, তারাই এখন সংসদে ভিন্ন অবস্থান নিচ্ছেন। এটা কি জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়?”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বক্তব্য
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর উদ্দেশে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব উভয়ই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাহলে সংসদে সেই রায়ের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া জনগণের রায়কে অস্বীকার করার শামিল।
তিনি বলেন, “এটা তো অন্তহীন প্রতারণা। জনগণের রায়কে অমান্য করার কোনো নৈতিক অধিকার কারও নেই।”
সংবিধান সংস্কার ও রাজনৈতিক সংকট
গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের দায় ক্ষমতাসীন জোটের ওপরই বর্তায়। তিনি দাবি করেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো গঠনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সংবিধান সংস্কার বিলম্বিত করা হচ্ছে।
তিনি সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানান। তাঁর ভাষায়, “সংকট তৈরি করেছে সরকার, সমাধানও সরকারকেই করতে হবে। বল এখন তাদের কোর্টে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও প্রতীকী ভাষা
বক্তৃতায় তিনি ক্রীড়াভিত্তিক উপমা ব্যবহার করে বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব বা ভুল পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তিনি ইঙ্গিত করেন, সময়মতো সিদ্ধান্ত না নিলে রাজনৈতিক “ব্যাকফায়ার” ঘটতে পারে।
সংসদ ও জনগণের ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক
গোলাম পরওয়ার বলেন, সংসদ কোনোভাবেই সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ নয়; বরং জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন। তাঁর মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি যে রায় দিয়েছে, তা সংসদের অবস্থানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি অভিযোগ করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জনগণের ভোটকে উপেক্ষা করা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী।
অন্যান্য নেতাদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সঞ্চালনা করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন মামুনুল হক, মজিবুর রহমান, আবদুল জলিল এবং নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, গণভোট, জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে চলমান বিতর্ক দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ভবিষ্যতে সংসদীয় রাজনীতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।