নেদারল্যান্ডসভিত্তিক একটি প্রমোদতরিতে হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে এবং আরও তিনজন অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজটিতে আকস্মিকভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর জরুরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ, এর বিস্তার পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি।
কী এই হান্টাভাইরাস
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাত প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ানো একটি ভাইরাসজনিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)–এর তথ্য অনুযায়ী, এই ভাইরাস সাধারণত ইঁদুরের প্রস্রাব, লালা ও বিষ্ঠার মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
সংক্রমিত স্থানে এসব বর্জ্য শুকিয়ে গেলে তা ধুলোতে পরিণত হয় এবং বাতাসে মিশে শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে ঘর পরিষ্কার বা ঝাড়ু দেওয়ার সময় এই ঝুঁকি বেশি থাকে।
চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট–এর তথ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদীর নামানুসারে এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে প্রথম এটি শনাক্ত হয়।
কীভাবে ছড়ায় সংক্রমণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস সাধারণত মানুষের মধ্যে সরাসরি ছড়ায় না। তবে আক্রান্ত ইঁদুরের সংস্পর্শে থাকা পরিবেশই মূল ঝুঁকির উৎস।
মূল সংক্রমণ পথগুলো হলো—
ইঁদুরের মল, প্রস্রাব বা লালা থেকে তৈরি ধুলা শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ
সংক্রমিত পরিবেশ স্পর্শ করে পরে মুখ, নাক বা চোখ স্পর্শ করা
বিরল ক্ষেত্রে আক্রান্ত প্রাণীর কামড়
কতটা বিপজ্জনক এই ভাইরাস
হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ দুই ধরনের মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করতে পারে—
ফুসফুসজনিত জটিলতা
কিডনি ক্ষতিগ্রস্তকারী রোগ
এর মধ্যে ফুসফুসে সংক্রমণজনিত জটিলতা সবচেয়ে প্রাণঘাতী। এটি হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম নামে পরিচিত। চিকিৎসা তথ্য অনুযায়ী, এই রোগে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
কানাডা সরকারের স্বাস্থ্য তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০০ জন এই রোগে আক্রান্ত হন।
উপসর্গ কীভাবে দেখা দেয়
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সিডিসি জানায়, সংক্রমণের ১ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রাথমিক উপসর্গগুলো হলো—
জ্বর
ক্লান্তি
শরীর ব্যথা
ফ্লু–জাতীয় লক্ষণ
পরবর্তী ধাপে দেখা দেয়—
তীব্র কাশি
শ্বাসকষ্ট
ফুসফুসে তরল জমা
অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক ৭২ ঘণ্টায় রোগ শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় এটি সাধারণ ফ্লু হিসেবে ভুল হতে পারে।
চিকিৎসা ও সীমাবদ্ধতা
হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা টিকা এখনো নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক। রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিক রাখা, পর্যাপ্ত তরল সরবরাহ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণই মূল চিকিৎসা।
গুরুতর ক্ষেত্রে রোগীকে ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দিতে হয়।
প্রতিরোধের উপায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভাইরাস প্রতিরোধের মূল উপায় হলো ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখযোগ্য—
ঘর ও পরিবেশে ইঁদুর প্রবেশ রোধ করা
ইঁদুরের মল বা প্রস্রাব শুকনো অবস্থায় না ঝাড়ু দেওয়া
পরিষ্কারের সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার
আক্রান্ত এলাকা ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করা
সাম্প্রতিক ঘটনার তাৎপর্য
নেদারল্যান্ডসের প্রমোদতরিতে এই সংক্রমণকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এটি জনসমাগমপূর্ণ পরিবেশ ও ভ্রমণ ব্যবস্থায় সংক্রামক রোগের ঝুঁকি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ ও সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলে সীমিত সংক্রমণও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।