রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল-এ ‘গেস্টরুমের আমলনামা’ শিরোনামে একটি ব্যানার টাঙানোকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হলভিত্তিক নির্যাতনের অভিযোগ। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ছাত্রদল।
ব্যানারে অভিযোগ, যুক্ত করা স্ক্রিনশট
গত রোববার রাতে হলের অতিথি কক্ষে (গেস্টরুম) ব্যানারটি টাঙায় ছাত্রদলের জহুরুল হক হল শাখা। এতে ইসলামী ছাত্রশিবির ও হল সংসদের কয়েকজন নেতাসহ মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে গেস্টরুমে নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। প্রমাণ হিসেবে নবীন শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো একাধিক খুদে বার্তার স্ক্রিনশট যুক্ত করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন হল সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইসমাইল সাদিক তাহছিন, কার্যনির্বাহী সদস্য তাসনিম রুবাইয়াত, আরাফ মাহমুদ, মো. হাসান আল বান্না, মুস্তাকিম রহমান ও মাহমুদুল হাসান। তাঁদের মধ্যে সাদিক তাহছিন ও তাসনিম রুবাইয়াত ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে নির্বাচনে জয়ী হন।
ব্যানারে প্রদর্শিত বার্তাগুলোতে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময়ে গেস্টরুমে উপস্থিত থাকার নির্দেশ, অনুপস্থিত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি এবং গণরুমে থাকার জন্য প্রস্তুত থাকার মতো বক্তব্য দেখা যায়।
অভিযুক্তদের দাবি: ‘চাপে পড়ে করা’
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ ইসমাইল সাদিক তাহছিন বলেন, অতীতে হলের ভেতরে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে জুনিয়রদের গেস্টরুমে ডাকতে বাধ্য করা হতো।
“মানসিক চাপে পড়ে দেওয়া কিছু মেসেজের স্ক্রিনশট নিয়ে এখন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে,”—বলেন তিনি।
একই ধরনের বক্তব্য দেন তাসনিম রুবাইয়াতও। তাঁর দাবি, সে সময়কার বাস্তবতায় গণরুমে থাকা এবং গেস্টরুম কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া অনেকের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং একতরফাভাবে দোষ চাপানো হচ্ছে।
ছাত্রদলের পাল্টা অভিযোগ
ব্যানারটি তৈরির উদ্যোক্তা ও ছাত্রদলের হল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ওমর আবদুল্লাহ চৌধুরী জিন্নাহ বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
“রাতের বেলা ঘুম থেকে তুলে গেস্টরুমে নেওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন—এসব ছিল বাস্তবতা। আমরা চাই নতুন শিক্ষার্থীরা যেন এসব সম্পর্কে সচেতন থাকে,”—বলেন তিনি।
তিনি আরও দাবি করেন, গেস্টরুম সংস্কৃতি কেবল একটি সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিভিন্ন গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল।
হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান আসিফ বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক কারণে গণরুমে থাকতে বাধ্য হলেও যারা গেস্টরুমে নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে তা স্বেচ্ছাকৃত ছিল।
“এটি ছিল প্রভাব বিস্তার ও নিজেদের প্রমাণ করার এক ধরনের প্রতিযোগিতা,”—মন্তব্য করেন তিনি।
উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি
গেস্টরুম ও গণরুমে নির্যাতনের বিচার এবং নবীন শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট নিরসনের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ছাত্রদল।
মঙ্গলবার দুপুরে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহসের নেতৃত্বে উপাচার্য কার্যালয়ে এই স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। এতে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে বিভিন্ন তথ্য ও স্ক্রিনশট সংযুক্ত করা হয়েছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, সিনিয়র সহসভাপতি মাসুম বিল্লাহ, সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসিরউদ্দীন শাওন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নূরে আলম ভূঁইয়া ইমনসহ অন্যান্য নেতারা।
প্রেক্ষাপট: গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ‘গেস্টরুম’ ও ‘গণরুম’ সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয়। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং হল ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
‘গেস্টরুমের আমলনামা’ ব্যানার ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সংস্কৃতির নানা অন্ধকার দিক সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সহনশীল আবাসিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।