দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও শিক্ষার্থীদের শেখার মানে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা, শিক্ষকদের কার্যকারিতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘ফ্রম এভিডেন্স টু অ্যাকশন: স্ট্রেনদেনিং লার্নিং, ইনক্লুশন অ্যান্ড ইনোভেশন ইন ক্লাসরুম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
পঞ্চম শ্রেণির দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না অধিকাংশ শিক্ষার্থী
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত ইউনিসেফের গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির মৌলিক দক্ষতাও অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে গণিত বিষয়ে পরিস্থিতি সবচেয়ে দুর্বল।
জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশের বেশি ‘নবিশ’ বা প্রাথমিক স্তরে ছিল। অর্থাৎ, তারা পঞ্চম শ্রেণির সক্ষমতার ভিত্তিতে নেওয়া পরীক্ষার অর্ধেক প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমরা সবাই সমস্যাগুলো জানি। কিন্তু কীভাবে সমস্যার সমাধান করছি, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা কি এই রিপোর্ট ফাইলে রেখে দেব, নাকি কার্যকর ব্যবস্থা নেব—এটা এখন আমাদের নিজেদের কাছেই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
‘এত টাকা খরচের পরও অবস্থার উন্নতি কোথায়?’
প্রায় দুই দশক আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এত বছর পরও শিক্ষাব্যবস্থায় দৃশ্যমান কোনো বড় পরিবর্তন তিনি দেখতে পাননি।
তিনি বলেন, “আমি নিজেই কোনো বড় উন্নতি দেখতে পাইনি।”
সরকার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) বাস্তবায়নে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আগের কর্মসূচিতেও প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
তবে এত বিপুল বিনিয়োগের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এত টাকা খরচের পর আমরা এখন যে অবস্থায় আছি, তার জবাব কে দেবে?”
মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকলেও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কম্পিউটার সরবরাহ এবং মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক কম্পিউটার, অনেক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম আছে। কিন্তু সেগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেটাই প্রশ্ন।”
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঠিকভাবে পড়তে পারে না—এমন তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতির জন্য শুধু শিক্ষক নয়, নীতিনির্ধারক, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায় নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ধারণায় এগোতে চায় সরকার
শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দমুখর শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” ধারণা সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে চায়।
তিনি গবেষণা প্রতিবেদনকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আরও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
দক্ষতা ও বাস্তবজীবনভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু সনদনির্ভর না রেখে দক্ষতা, মূল্যবোধ ও বাস্তব জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।
তিনি জানান, সরকার গবেষণাভিত্তিক তথ্য ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে চায়। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হয়ে অংশগ্রহণমূলক ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির দিকে যেতে হবে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির সঙ্গে জাপানি, কোরিয়ান, ফরাসি, জার্মান কিংবা আরবির মতো তৃতীয় ভাষা শিক্ষার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়।
তিনি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন এবং বিদ্যালয়কে শুধু পাঠদানের স্থান নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
গবেষণায় উঠে এলো আংশিক ইতিবাচক অগ্রগতি
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় দেশের বিভিন্ন এলাকার ১৪২টি বিদ্যালয়ের ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং ৮০০–এর বেশি শিক্ষক অংশ নেন। গবেষণাটি পরিচালনা করে ইউনিসেফ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো।
গবেষণার অংশ হিসেবে দুই বছরব্যাপী পাইলট কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্রও উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলা ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফল গড়ে ৪ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, স্কুল বন্ধ থাকা, পরিবর্তিত শিক্ষাপঞ্জি এবং নানা বিঘ্নের মধ্যেও এই অগ্রগতি অর্থবহ।
‘নীতিমালা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই মূল বিষয়’
অনুষ্ঠানে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু নীতিমালা প্রণয়নের ওপর নির্ভর করে না; প্রকৃত সাফল্য আসে কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান, শিক্ষকদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, অভিভাবকদের আস্থা এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে শেখার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া আরও বলেন, কেবল পরীক্ষামূলক প্রকল্প নয়, বরং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ শিক্ষাসংস্কারের ভিত্তি হওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানে গবেষণা ফলাফল তুলে ধরেন ইউনিসেফের শিক্ষা ব্যবস্থাপনাবিষয়ক গবেষণা দলের প্রধান থমাস ওয়েলস ড্রেসেন এবং একই গবেষণা দলের পরামর্শক অনিন্দিতা নুগ্রহ। এছাড়া বক্তব্য দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শঙ্কর।
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক