ঢাকা

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য বড় সিদ্ধান্ত, ট্রাম্পের দিকে তাকিয়ে মার্কিন সেনারা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও আংশিক যুদ্ধবিরতির মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখনো উচ্চমাত্রার সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সামরিক ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর পরবর্তী বড় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনারা, যারা ইতোমধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে।

এ তথ্য প্রকাশ করেছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।

৫০ হাজারের বেশি সেনা, অতিরিক্ত মোতায়েন

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ আগে থেকেই অঞ্চলে অবস্থান করছিল। যুদ্ধ শুরুর পর অতিরিক্ত অন্তত ১০ হাজার সেনা বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার, মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট ও যুদ্ধবিমান ঘিরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে।

এই বাহিনীর সদস্যদের প্যারাশুট, জরুরি সারভাইভাল কিট এবং যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’

মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এই সামরিক অভিযানের নাম নিয়ে একাধিক দফায় পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আক্রমণ পর্যায় শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এই অভিযান মূলত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

তবে ট্রাম্প নিজেই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

ট্রাম্পের কঠোর বার্তা: “চুক্তি না হলে বোমা হামলা”

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ইরান যদি নির্ধারিত শর্ত মেনে নেয় তবে যুদ্ধ শেষ হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে।

তবে তিনি একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দেন, শর্ত না মানলে “আবারও বোমা হামলা শুরু হবে”। তবে এই শর্তগুলো কী, তা তিনি প্রকাশ করেননি।

নৌ অবরোধ ও নতুন হামলা

প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বুধবার ইরানের একটি তেলবাহী ট্যাংকার অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে মার্কিন যুদ্ধবিমান সেটিকে অকার্যকর করে দেয়।

ঘাঁটি থেকে সরিয়ে নেওয়া ও অনিশ্চয়তা

যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। বর্তমানে তা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে একাধিক সামরিক সূত্র জানায়। তবে ইরানের পাল্টা হামলার কারণে কিছু ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ায় সঠিক সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন ঘাঁটিগুলো রয়েছে সৌদি আরব, বাহরাইন, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত–এ।

এলিট বাহিনী ও সম্ভাব্য অভিযান

মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ইউনিট ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন–এর প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রুপার বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। যদিও তাদের অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে, সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তারা সম্ভাব্য স্থল অভিযান বা কৌশলগত দখল অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে।

বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্রীয় অবকাঠামো লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

এছাড়া ৩১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট–এর প্রায় ৫ হাজার মেরিন ও নৌসেনা অঞ্চলটিতে মোতায়েন রয়েছে, যাদের সম্ভাব্য দ্বীপ বা উপকূলীয় অভিযানেও ব্যবহার করা হতে পারে।

বিশেষ অভিযান বাহিনী ও পারমাণবিক স্থাপনা

মার্কিন বিশেষ বাহিনী (স্পেশাল অপারেশনস ট্রুপস)–এর কয়েকশ সদস্যকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। সামরিক সূত্রের ধারণা, তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, বিশেষ করে ইস্পাহান কেন্দ্র লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনায় ব্যবহৃত হতে পারে।

বিমানবাহী রণতরি ও নৌ শক্তি

বর্তমানে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ–এর স্ট্রাইক গ্রুপসহ ১০ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন আরব সাগরে অবস্থান করছে।

এ ছাড়া ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে সরিয়ে নেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর এখনো অঞ্চলটিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিমানবাহী রণতরি থেকে যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা বজায় রাখা হয়েছে।

অনিশ্চিত কূটনীতি ও যুদ্ধের ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি—এই দ্বৈত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বারবার অবস্থান পরিবর্তন এবং মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়হীন সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে এখনো মূল প্রশ্ন একটাই—ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্ত কোন দিকে মোড় নেয়: কূটনৈতিক সমাধান, নাকি আরও বড় সামরিক সংঘাত।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স