ঢাকা

মহাসড়কে এআই ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ, চাঁদাবাজি কমার আশা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরার নজরদারি চালু হওয়ায় চাঁদাবাজি কমে আসবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর মতে, মহাসড়কে মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন কিংবা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি হলে ক্যামেরায় তা রেকর্ড হওয়ার সুযোগ থাকায় এ ধরনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাট এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মহাসড়কে যে চাঁদাবাজি হয়, সেটা মালিকপক্ষ থেকে হোক, শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে হোক অথবা পুলিশের পক্ষ থেকে হোক—সবকিছু ক্যামেরায় যেহেতু রেকর্ডেড থাকবে, আশা করি, এই প্রবণতাটা কমবে। আমি বিশ্বাস করি, জনগণের সহযোগিতায় আমরা মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারব।’

৪৯০ পিলারে ক্যামেরা

মহাসড়কে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হাইওয়ে পুলিশ একটি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪৯০টি পিলারে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা ও এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

এসব ক্যামেরার মাধ্যমে মহাসড়কে যানবাহনের চলাচল সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তির সাহায্যে চালকদের বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করা হবে। এর ফলে সড়কে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানুষের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নিয়ম ভঙ্গের ঘটনাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মহাসড়কের যান চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রাথমিকভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ব্যবস্থা চালু করে এর কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করা হবে।

যেসব অপরাধ শনাক্ত করবে এআই ক্যামেরা

নতুন অটো ফাইন সিস্টেমে নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করা, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং এবং সড়কের সাইন-সিগন্যাল অমান্য করার মতো বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করা হবে।

ক্যামেরায় কোনো যানবাহনের আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হবে। এরপর জরিমানা আরোপ করে সেই তথ্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।

এর ফলে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা শনাক্ত থেকে শুরু করে জরিমানার তথ্য সংরক্ষণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি প্রযুক্তিনির্ভর করার সুযোগ তৈরি হবে।

গাড়ির মালিককে এসএমএসে জরিমানার তথ্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ হলে গাড়ির মালিকের মুঠোফোনে এসএমএসের মাধ্যমে জরিমানার তথ্য জানানো হবে। ফলে আইন ভঙ্গের জন্য জরিমানা হয়েছে কি না, তা জানতে গাড়ির মালিককে সরাসরি কোনো দপ্তরে যেতে হবে না।

নির্ধারিত মুঠোফোন আর্থিক সেবার মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধের সুযোগও থাকবে। এতে জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে একই গাড়ি একাধিকবার আইন ভঙ্গ করলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও বক্তব্য দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, কোনো গাড়িতে তিনবার জরিমানা হলে তার নিবন্ধন বাতিল করা হবে কি না, সে বিষয়ে বিআরটিএর প্রচলিত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অর্থাৎ একাধিকবার আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনে নিবন্ধনসংক্রান্ত কঠোর ব্যবস্থারও সুযোগ থাকবে।

ধাপে ধাপে দেশের সব মহাসড়কে

প্রাথমিকভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অটো ফাইন সিস্টেম চালু করা হলেও এটি দেশের অন্য মহাসড়কেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ব্যবস্থা চালুর পর এর বিভিন্ন ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পর্যায়ক্রমে দেশের সব মহাসড়কে অটো ফাইন সিস্টেম চালু করা হবে।

এ ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে পরবর্তী সম্প্রসারণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, আইনগত বিষয় এবং বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা দেখা দেবে, সেগুলো সমাধানের পর অন্য মহাসড়কে ব্যবস্থা চালু করা হবে বলে জানান তিনি।

জনগণকে সচেতন করবে পুলিশ

নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও চালকদের এ বিষয়ে সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অটো ফাইন সিস্টেম সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হাইওয়ে পুলিশ ও বাংলাদেশ পুলিশ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালাবে। পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে চালক ও গাড়ির মালিকদের নতুন ব্যবস্থার নিয়মকানুন সম্পর্কে জানানো হবে।

কারণ শুধু ক্যামেরা বসানো বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা আরোপ করলেই সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করা এবং নতুন ব্যবস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

মহাসড়কে থ্রি-হুইলার নিয়ে কঠোর অবস্থান

মহাসড়কে তিন চাকার যান বা থ্রি-হুইলার চলাচলের বিষয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, থ্রি-হুইলারগুলোকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা করা হবে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো অবস্থাতেই মহাসড়কে নন-মোটরাইজড যানবাহন বা থ্রি-হুইলার চলতে দেওয়া হবে না।

মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের চলাচল দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তাই মহাসড়কের নিরাপত্তা ও যান চলাচলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এ ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধে বিদ্যমান বিধিনিষেধ কার্যকর করার কথা জানান তিনি।

লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

লাইসেন্সবিহীন যানবাহন চলাচলের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেসব যানবাহনের লাইসেন্স নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশ প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

তিনি এ ক্ষেত্রে মালিক, শ্রমিক ও পুলিশ—সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়; পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

চাঁদাবাজি বন্ধে প্রযুক্তির ব্যবহার

মহাসড়কে চাঁদাবাজি দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতের একটি আলোচিত সমস্যা। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে কারা জড়িত, তা শনাক্ত করা এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই ক্যামেরার নজরদারি এ ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যানবাহনের চলাচল ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ক্যামেরায় ধারণ করা হলে অপরাধ বা অনিয়মের ঘটনার পর তা পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকবে।

তিনি মনে করেন, সবকিছু প্রযুক্তির নজরদারির আওতায় থাকলে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে এবং অপরাধীদের মধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে।

অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন

অটো ফাইন সিস্টেম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ফারুক আহমেদ।

এ সময় নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনার নতুন অধ্যায়

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই প্রযুক্তিনির্ভর অটো ফাইন সিস্টেম চালুর মধ্য দিয়ে দেশের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও এক ধাপ এগোল। আইন ভঙ্গ শনাক্ত, জরিমানা আরোপ এবং গাড়ির মালিককে তথ্য জানানোর প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার ফলে সড়ক ব্যবস্থাপনায় গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে নতুন এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তির নির্ভুলতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্যের নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর। পাশাপাশি ক্যামেরায় শনাক্ত হওয়া অপরাধের ক্ষেত্রে আপিল বা ভুল শনাক্তকরণের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ব্যবস্থাটির ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর পর্যায়ক্রমে দেশের সব মহাসড়কে এটি চালু করা হবে। ফলে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে মহাসড়কের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স