রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত জুলাইয়ে তুরস্ক সফরের শেষ মুহূর্তে তাঁর বিমান পরিবর্তন এবং সাংবাদিকদের কাছ থেকে বিষয়টি গোপন রাখার ঘটনা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কাছে সে সময় ঘটনাটি ছিল ধোঁয়াশাপূর্ণ। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, এর পেছনে ছিল প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা।
রয়টার্সের সাংবাদিক গ্রাম স্ল্যাটারি, যিনি ওই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন, তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে ট্রাম্পের দেশে ফেরার পরিকল্পনায় হঠাৎ পরিবর্তন আনা হয়। অথচ এর কিছুক্ষণ আগেও তিনি কাতারের রাজপরিবারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজে করেই আঙ্কারায় এসেছিলেন।
পরে জানা যায়, সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত রেখে ট্রাম্পকে এক বিমান থেকে আরেক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এমনকি যেই উড়োজাহাজে ট্রাম্প রয়েছেন বলে সাংবাদিকদের ধারণা দেওয়া হয়েছিল, সেটিতে ওঠার সময় তাঁদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়।
সেই নির্দেশের কারণ জানতে চাইলে সাংবাদিকদের বলা হয়েছিল, এটি সিক্রেট সার্ভিসের অনুরোধ।
তখনও তাঁরা বুঝতে পারেননি, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে কী ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
আর যখন ট্রাম্পকে সরাসরি এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিন্তু যদি আমি মারা যাই, আপনারাও যাবেন। তাই তো?’
এই মন্তব্যই পরে পুরো ঘটনার সবচেয়ে নাটকীয় অংশ হয়ে ওঠে।
শুরু থেকেই কিছু একটা অস্বাভাবিক ছিল
গত ৮ জুলাই তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিন। সফর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ট্রাম্প। তাঁর সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের ধারণা ছিল, আঙ্কারা থেকে তিনি নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানেই দেশে ফিরবেন।
গত বছর কাতারের রাজপরিবার ট্রাম্পকে একটি বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজ উপহার দেয়। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করার পর সেটিকে ভবিষ্যৎ এয়ারফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সম্প্রতি ট্রাম্প ওই উড়োজাহাজে ভ্রমণও শুরু করেন।
তুরস্কে যাওয়ার সময়ও তিনি সেটিতেই গিয়েছিলেন।
কিন্তু হঠাৎ করেই ৮ জুলাই ট্রাম্প জানান, তিনি ওই নতুন উড়োজাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবেন না।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, নতুন উড়োজাহাজটি আগেই ইংল্যান্ডের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সেটি দেখতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প জানান, তিনি পুরোনো একটি এয়ারফোর্স ওয়ানে করে মিলডেনহল যাবেন। তবে সেখান থেকে কীভাবে ওয়াশিংটনে ফিরবেন, সে বিষয়ে তখন স্পষ্ট কোনো তথ্য দেননি।
সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হয়।
সাংবাদিকদের মনে তৈরি হয় ইরানি হামলার আশঙ্কা
রয়টার্সের সাংবাদিক গ্রাম স্ল্যাটারি বলেন, সফরসূচিতে আকস্মিক পরিবর্তন এবং ট্রাম্পের ব্যাখ্যা তাঁদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
সাংবাদিকদের মধ্যে তখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—ইরান কি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হত্যার কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেছে?
কারণ, ট্রাম্প নিজেও সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাঁকে হত্যার হুমকির কথা বারবার উল্লেখ করছিলেন।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক—বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের হুমকির বিষয়টি সামনে আনছিলেন।
তবে তখনও সাংবাদিকেরা জানতেন না, তাঁদের চোখের সামনে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন কার্যকর করা হচ্ছে।
জানালার পর্দা নামানোর নির্দেশ
আঙ্কারা থেকে ইংল্যান্ডের মিলডেনহল যাওয়ার সময় আরও একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে।
সাংবাদিকদের যে উড়োজাহাজে প্রেসিডেন্ট রয়েছেন বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, তাতে ওঠার সময় হোয়াইট হাউসের কর্মীরা তাঁদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলেন।
কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, এটি সিক্রেট সার্ভিসের নির্দেশ।
স্ল্যাটারি জানান, প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন, এমন নির্দেশনা স্বাভাবিক নয়।
তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—কোনো গোপন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি সাংবাদিকদের দৃষ্টির আড়ালে রাখা হচ্ছে?
পরে জানা যায়, জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশের সঙ্গে প্রেসিডেন্টকে গোপনে এক উড়োজাহাজ থেকে অন্য উড়োজাহাজে স্থানান্তরের পরিকল্পনার সম্পর্ক ছিল।
সাংবাদিকদের চোখের সামনেই চলছিল ‘ছলনা’
আঙ্কারা থেকে যাত্রা শেষে সাংবাদিকদের বহনকারী উড়োজাহাজটি ইংল্যান্ডে অবতরণ করে।
সাংবাদিকদের ধারণা ছিল, প্রেসিডেন্টও তাঁদের সঙ্গে একই উড়োজাহাজে রয়েছেন। কিন্তু উড়োজাহাজ থেকে নামার সময় তাঁরা দেখলেন, ট্রাম্প উড়োজাহাজের অন্য একটি অংশ থেকে বেরিয়ে আসছেন।
পরে বোঝা যায়, পুরো ঘটনাটি ছিল একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
হোয়াইট হাউসের কর্মীরা সাংবাদিকদের ট্রাম্পকে অনুসরণ করতে বলেন। প্রেসিডেন্ট হাঁটতে হাঁটতে কয়েক শ গজ দূরে পার্ক করে রাখা কাতারের উপহার দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের দিকে এগিয়ে যান।
তাঁর দুই পাশে ছিল সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা। সাংবাদিকদের পাশ দিয়ে একটি কালো সরকারি এসইউভিও ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল।
স্ল্যাটারির কাছে দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। তিনি বলেন, হোয়াইট হাউসের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার সময়ে এমন কৌশল আগে দেখেননি।
সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, তখনো সাংবাদিকেরা জানতেন না কেন তাঁদের এমনভাবে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের ব্যাখ্যা ছিল অন্য রকম
নতুন উড়োজাহাজে ওঠার পর হোয়াইট হাউসের একজন সহকারী সাংবাদিকদের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ট্রাম্পের পোস্টের একটি ছাপা কপি দেন।
সেখানে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজের সামনে জড়ো হওয়া মার্কিন সামরিক সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছবি ছিল।
ট্রাম্প পোস্টে দাবি করেন, বিমানঘাঁটির ‘পুরো’ কর্মীবাহিনী উড়োজাহাজটি দেখতে চেয়েছিল। এ কারণে মিলডেনহলে যাত্রাবিরতি করা হয়েছিল এবং আঙ্কারা থেকে ওয়াশিংটনের স্বাভাবিক রুট থেকে খুব সামান্যই বিচ্যুত হতে হয়েছিল।
কিন্তু সাংবাদিকদের কাছে এই ব্যাখ্যা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের কেবিনে আসেন। তাঁরা একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন—কেন তিনি কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজে করে ইংল্যান্ডে গেলেন না? এর প্রকৃত কারণ কী?
সেই মুহূর্তে তাঁরা নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি।
তৃতীয় একটি উড়োজাহাজের রহস্য
ঘটনার প্রায় এক মাস পর সাংবাদিকেরা জানতে পারেন, পুরো পরিকল্পনায় আরও একটি উড়োজাহাজ জড়িত ছিল।
অর্থাৎ, মিলডেনহল যাওয়ার পথে সাংবাদিকেরা যে উড়োজাহাজে ট্রাম্প রয়েছেন বলে মনে করেছিলেন, বাস্তবে তিনি সেটিতে ছিলেন না।
প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য গোপনে অন্য একটি সামরিক উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই পরিকল্পনার কারণে সাংবাদিকেরা প্রেসিডেন্টের অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্ত ছিলেন। জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশও ছিল একই পরিকল্পনার অংশ।
এর ফলে তুরস্ক থেকে ইংল্যান্ড পর্যন্ত যাত্রাপথে ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান সাংবাদিকদের কাছ থেকে গোপন রাখা সম্ভব হয়।
কেন এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
রয়টার্সের সাংবাদিক স্ল্যাটারি বলেন, পরে ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগই বিমান পরিবর্তনের মূল কারণ ছিল।
কাতারের দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান তখনও পুরোপুরি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা মান পূরণ করেছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
স্ল্যাটারির মতে, যদি নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের প্রাথমিক ধারণা সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সুবিধার ঘাটতি ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টকে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ একটি উড্ডয়নে না পাঠিয়ে নিরাপদ সামরিক উড়োজাহাজে স্থানান্তর করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ওই সময় বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তথ্য পাওয়া কঠিন
স্ল্যাটারি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে থাকা সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তার কারণে তথ্য পাওয়া সব সময় সহজ নয়।
এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাধারণত ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। হোয়াইট হাউসের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগও সীমিত থাকে।
ফলে প্রেসিডেন্টের গতিবিধি বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানার সুযোগ সাংবাদিকদের থাকে না।
আঙ্কারা থেকে মিলডেনহল পর্যন্ত যাত্রাও এ কারণেই রহস্যময় ছিল।
সাংবাদিকেরা ধরে নিয়েছিলেন, ট্রাম্প যেকোনো সময় তাঁদের সামনে আসতে পারেন। কিন্তু তিনি অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তাঁদের সঙ্গে যোগ দেননি।
স্ল্যাটারি তখন বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। কারণ, এয়ারফোর্স ওয়ানে ভ্রমণের সময় ট্রাম্প প্রায়ই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা এড়িয়ে যান।
কিন্তু পরে পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট সামনে আসায় তাঁর অনুপস্থিতির কারণ পরিষ্কার হয়ে যায়।
‘যদি আমি মরি, আপনারাও মরবেন’
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি আসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাংবাদিকদের সরাসরি কথোপকথনের সময়।
সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করেন, কেন তাঁদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল।
ট্রাম্প তখন ইরানের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের হুমকির বিষয়টি স্বীকার করেন।
এরপর তিনি সাংবাদিকদের বলেন—
‘কিন্তু যদি আমি মারা যাই, আপনারাও যাবেন। তাই তো? হয়তো কোনো এক দিন আপনারাও পেশা বদলাতে চাইবেন।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, সাংবাদিকদেরও তিনি একই নিরাপত্তা ঝুঁকির অংশ হিসেবে দেখছিলেন। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা হলে তাঁর সঙ্গে থাকা সাংবাদিকেরাও একই হামলার শিকার হতে পারেন—এমন আশঙ্কা তাঁর মধ্যে ছিল।
এ কারণেই সম্ভবত তাঁদের কাছ থেকেও প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান ও বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।
ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধের প্রেক্ষাপট
ট্রাম্পের এই সতর্কতার পেছনে ছিল ইরানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধ।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে রয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কঠোর বিরোধিতা করে আসছে। ট্রাম্পও বিভিন্ন সময়ে ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে ইরানি হামলার আশঙ্কা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে ৮ জুলাইয়ের ঘটনার সময় প্রেসিডেন্টের বিমান পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা কারণ তখন প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
পরে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান ও ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি নিয়মিত সফরসূচি পরিবর্তন ছিল না।
পুরো ঘটনাটি কেন গোপন রাখা হয়েছিল
প্রেসিডেন্টের অবস্থান ও যাত্রাপথ গোপন রাখা ছিল নিরাপত্তা পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যদি কোনো সম্ভাব্য হামলাকারী আগেই জানতে পারে প্রেসিডেন্ট কোন উড়োজাহাজে আছেন, কোন রুটে যাচ্ছেন এবং কখন কোথায় অবতরণ করবেন, তাহলে হামলার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
তাই সাংবাদিকদেরও বিভ্রান্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে ঘটনাপ্রবাহ থেকে ধারণা করা যায়।
একটি উড়োজাহাজে সাংবাদিকদের রাখা, জানালার পর্দা নামিয়ে দেওয়া, প্রেসিডেন্টকে অন্য উড়োজাহাজে গোপনে স্থানান্তর এবং পরে নির্দিষ্ট সময়ে তাঁকে নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের সামনে হাজির করা—সব মিলিয়ে এটি ছিল অত্যন্ত সমন্বিত একটি নিরাপত্তা পরিকল্পনা।
স্ল্যাটারির বর্ণনায়, সাংবাদিকেরা প্রথমে বুঝতেই পারেননি যে তাঁরা নিজেরাই ওই নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হয়ে গেছেন।
এক মাস পর পরিষ্কার হলো পুরো চিত্র
ঘটনার সময় সাংবাদিকেরা শুধু বুঝতে পেরেছিলেন যে কিছু একটা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু এক মাস পর তৃতীয় একটি উড়োজাহাজ ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসার পর পুরো ঘটনাটির অর্থ বদলে যায়।
ট্রাম্পকে যে উড়োজাহাজে সাংবাদিকেরা রয়েছেন বলে মনে করেছিলেন, তিনি আসলে সেখানে ছিলেন না। তাঁকে নিরাপদে অন্য একটি সামরিক উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
এরপর সাংবাদিকদের নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের দিকে নিয়ে গিয়ে এমন একটি দৃশ্য তৈরি করা হয়, যাতে মনে হয় প্রেসিডেন্ট তাঁদের সঙ্গে একই উড়োজাহাজে যাত্রা করেছেন।
এই পুরো পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখা।
নিরাপত্তা বনাম স্বচ্ছতার প্রশ্ন
ঘটনাটি প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার পাশাপাশি সাংবাদিকদের জানার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
একদিকে প্রেসিডেন্টের চলাচল ও অবস্থান গোপন রাখা তাঁর নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সফররত সাংবাদিকেরা নিজেরাই যখন সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, তখন তাঁদের সেই ঝুঁকি সম্পর্কে কতটা জানানো হবে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
স্ল্যাটারি বলেন, তখন সাংবাদিকেরা জানতেন না কেন তাঁদের পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হচ্ছে কিংবা কেন ট্রাম্প তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তায় আসছেন না।
পরে যখন পুরো ঘটনার কারণ সামনে আসে, তখন বোঝা যায়, বিষয়টি ছিল অনেক বেশি গুরুতর।
আর ট্রাম্পের সেই এক বাক্য—‘যদি আমি মারা যাই, আপনারাও যাবেন’—ঘটনাটির সবচেয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে।
এতে স্পষ্ট হয়, ওই সময় শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নয়, তাঁর সঙ্গে থাকা সাংবাদিকদের জীবন নিয়েও সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।