আল–জাজিরা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের চার মাস পূর্ণ হতে চলেছে। এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিই বদলে দেয়নি, বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, ব্যাহত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বেড়েছে পরিবহন ও বিমা খরচ।
তবে এই সংঘাতের প্রভাব সবার জন্য এক রকম হয়নি। যেখানে সাধারণ মানুষ জ্বালানি, খাদ্য ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনুভব করছে, সেখানে কিছু ব্যবসায়িক খাত এই সংকটকে বিপুল মুনাফা অর্জনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা, বড় বিনিয়োগ ব্যাংক, পণ্য পরিবহন ও বিমা কোম্পানিগুলো যুদ্ধকালীন বাজার পরিস্থিতি থেকে বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পেয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলছে। এই সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তি হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে যুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া মুনাফার সুযোগ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতোমধ্যে বড় আকার ধারণ করেছে।
জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় লাভ
ইরান যুদ্ধ থেকে সবচেয়ে বেশি সরাসরি লাভবান হয়েছে জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। যুদ্ধের আগে বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছায়, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পর দাম কমে বর্তমানে প্রায় ৭২ ডলারে নেমে এসেছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির সময় বিশ্বের বড় তেল কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রথম প্রান্তিকের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ২৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানি চালু রাখতে কোম্পানিটি সৌদি আরবের ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) প্রথম প্রান্তিকে ৩২০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।
এ ছাড়া শেল প্রথম প্রান্তিকে প্রায় ৬৯০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। আগের বছরের একই সময়ে তাদের মুনাফা ছিল প্রায় ৫৬০ কোটি ডলার।
ফ্রান্সের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিসও সংঘাতের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। প্রথম প্রান্তিকে তাদের সংশোধিত নিট আয় দাঁড়িয়েছে ৫৪০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৪২০ কোটি ডলারের চেয়ে বেশি।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্টাড এনার্জির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধকালীন তেলের উচ্চমূল্য থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে সৌদি আরামকো।
প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট থমাস লাইলস বলেন, দীর্ঘ সময় তেলের দাম বেশি থাকলে প্রায় সব তেল কোম্পানিই বড় ধরনের নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে।
এলএনজি কোম্পানির জন্য নতুন সুযোগ
শুধু তেল কোম্পানিই নয়, এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এই সংকট থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি পরিবহন করা হয়। যুদ্ধের কারণে ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকেছে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি কোম্পানি ভেঞ্চার গ্লোবাল ও চেনিয়েরে এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই অতিরিক্ত মুনাফা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তেলের দাম কমতে পারে এবং উচ্চমূল্যের কারণে চাহিদা কমে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অস্ত্র নির্মাতাদের ব্যবসা বেড়েছে
ইরান যুদ্ধের আরেক বড় সুবিধাভোগী হয়েছে প্রতিরক্ষা শিল্প।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিশ্বের বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে আসায় সরকার অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। হোয়াইট হাউসে আরটিএক্স, লকহিড মার্টিন, বোয়িং, নর্থরপ গ্রুম্যান, বিএই সিস্টেমস, এলথ্রিহ্যারিস ও হানিওয়েলের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশও নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ায় এসব কোম্পানির ক্রয়াদেশ আরও বেড়েছে।
বোয়িংয়ের প্রথম প্রান্তিকের আয় ১৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি এখনো লোকসানে রয়েছে, তবে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
নর্থরপ গ্রুম্যানের হাতে থাকা ক্রয়াদেশের পরিমাণ রেকর্ড ৯ হাজার ৫৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট ও ব্রাউন ইউনিভার্সিটির যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বেসরকারি অস্ত্র কোম্পানিগুলো মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি পেয়েছে।
এর মধ্যে প্রায় ৭৭১ বিলিয়ন ডলার গেছে মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাছে—লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স, বোয়িং, জেনারেল ডায়নামিক্স ও নর্থরপ গ্রুম্যান।
পরিবহন ও বিমা খাতে বাড়তি আয়
যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচলেও বড় পরিবর্তন এসেছে। হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকি বাড়ায় অনেক জাহাজ বিকল্প পথে চলাচল করছে।
এর ফলে তেলবাহী ট্যাংকারের ভাড়া ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
ফ্রন্টলাইন ও ডিএইচটি হোল্ডিংসের মতো ট্যাংকার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ পরিস্থিতি থেকে লাভবান হয়েছে।
ফ্রন্টলাইন প্রথম প্রান্তিকে ৫৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি আয় করেছে।
অন্যদিকে যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমার খরচও কয়েক গুণ বেড়েছে। আগে যেখানে হরমুজ অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজের বিমা খরচ ছিল জাহাজের মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, তা বেড়ে অনেক ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে।
ফলে বিমা কোম্পানিগুলোও বড় ধরনের অতিরিক্ত আয় করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্দার্ন কলোরাডোর অধ্যাপক কনস্ট্যান্টিন গুরদগিভ বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিমা কোম্পানিগুলো স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে লাভবান হতে পারে। তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলে তাদের বড় লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলোর মুনাফা
যুদ্ধের কারণে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো লাভবান হয়েছে।
তেলের দাম, মুদ্রা ও বন্ড বাজারে ওঠানামা বাড়ায় ট্রেডিং কার্যক্রম বেড়ে যায়।
জেপি মরগান চেজ, ব্যাংক অব আমেরিকা, সিটিগ্রুপ, মরগান স্ট্যানলি, গোল্ডম্যান স্যাকস ও ওয়েলস ফার্গো—এই ছয়টি ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে যৌথভাবে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে।
জেপি মরগান একাই ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে।
ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বেশি আয় এসেছে ফিক্সড ইনকাম, কারেন্সি ও পণ্য (এফআইসিসি) ট্রেডিং বিভাগ থেকে।
যুদ্ধ ঘিরে অনলাইন বাজির অভিযোগ
যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে অনলাইন ‘প্রেডিকশন মার্কেট’ বা বাজির প্ল্যাটফর্ম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পলিমার্কেট ও কালশির মতো প্ল্যাটফর্মে যুদ্ধবিরতি বা সংঘাতের সম্ভাব্য ফলাফলের ওপর অর্থ বাজি ধরা হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণ আগে তেলের ফিউচার বাজারে বড় অঙ্কের লেনদেনের বিষয়টি সন্দেহ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগে কিছু নতুন অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অঙ্কের বাজি ধরার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত দুই লাখের বেশি বাজির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অ্যাকাউন্টের বড় অংশ অস্বাভাবিকভাবে সফল হয়েছে।
গবেষকদের মতে, গোপন তথ্য ছাড়া এত বেশি জয়ের হার পরিসংখ্যানগতভাবে অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
সংকটের লাভ-ক্ষতির অসম চিত্র
ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে, একটি সামরিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না।
একদিকে সাধারণ ভোক্তা, ব্যবসা ও আমদানিনির্ভর দেশগুলো মূল্যবৃদ্ধি ও অনিশ্চয়তার চাপ বহন করছে। অন্যদিকে কিছু নির্দিষ্ট খাত—বিশেষ করে জ্বালানি, অস্ত্র, ব্যাংকিং, পরিবহন ও বিমা প্রতিষ্ঠান—এই সংকট থেকে বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হতে পারে।