শান্তি আলোচনা ঘিরে দীর্ঘ অচলাবস্থা এবং নতুন করে ইরান যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফরের মূল ফোকাস বাণিজ্য হলেও আড়ালে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠতে পারে ইরান সংকট।
রয়টার্স ও এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প এমন এক সময়ে চীনে পৌঁছেছেন যখন ওয়াশিংটন–তেহরান শান্তি আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে।
বেইজিংয়ে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন
বুধবার বেইজিংয়ে পৌঁছান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটি ২০১৭ সালে তার প্রথম মেয়াদে চীন সফরের পর প্রথম বেইজিং সফর।
বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংসহ উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিরা। লালগালিচা অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে সফরের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
বিমানবন্দর ছাড়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন,
“আমরাই দুই পরাশক্তি। সামরিক শক্তির দিক থেকে আমরাই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।”
ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার টানা বৈঠকের কথা রয়েছে, যেখানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছাড়াও কৌশলগত ইস্যুতে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরান সংকট: আলোচনার অঘোষিত কেন্দ্রবিন্দু
এই সফরের সময় সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে উঠতে পারে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি। এক মাসের বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান শান্তি আলোচনা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই অচলাবস্থায় পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যর্থতা নতুন করে সংঘাত শুরুর ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চুক্তি না হলে ইরানে নতুন হামলা শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যেকোনো মার্কিন হামলার জবাব দ্রুত ও কঠোরভাবে দেওয়া হবে।
চীনের কৌশলগত অবস্থান
ইরান সংকটে চীনের ভূমিকা এখন বৈশ্বিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং চীনই ইরানের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল ক্রেতা।
হরমুজ প্রণালি সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা চীনের অর্থনীতিতেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
চীন একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য, ফলে যেকোনো ভবিষ্যৎ চুক্তিতে তাদের ভূমিকা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরানও সম্ভাব্য কোনো সমঝোতায় চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিং সফর করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় তেহরান কূটনৈতিকভাবে চীনের ভূমিকা আরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
ট্রাম্পের অবস্থান: ‘আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই’
চীন সফরের আগে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের কোনো সহায়তার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন,
“ইরান বিষয়ে আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। শান্তিপূর্ণভাবে হোক বা অন্য কোনোভাবে, আমরাই এই পরিস্থিতি সামলাব।”
তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা আরও জটিল। কারণ ইরান সংকটে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: সি চিন পিংয়ের ভূমিকা কি হবে?
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে যাই বলুন না কেন, বেইজিং বৈঠকে ইরান ইস্যু গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড্যান গ্রেজিয়ার বলেন,
“ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে এবং সমঝোতায় আনতে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সি চিন পিংকে পাশে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হবে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”
তার মতে, চীন সরাসরি মধ্যস্থতাকারী না হলেও তারা তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্ভাব্য সমীকরণ: বাণিজ্য বনাম যুদ্ধনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মূল এজেন্ডা বাণিজ্য হলেও এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বড় কৌশলগত হিসাব–নিকাশ।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় চীনকে ইরান বিষয়ে চাপ প্রয়োগে ব্যবহার করতে, অন্যদিকে বেইজিং চাইবে সংকটকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যাতে জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
এই দ্বৈত চাপের মধ্যেই বেইজিং বৈঠক ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
ইরান যুদ্ধ যদি পুনরায় তীব্র হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, শিপিং রুট এবং বড় অর্থনীতিগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে চীন, ভারত ও ইউরোপ—সবাই এর অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করবে।
এই বাস্তবতায় ট্রাম্প–সি বৈঠককে শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সম্ভাব্য ‘সংকট ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বেইজিং সফর তাই শুধু বাণিজ্যিক আলোচনার নয়, বরং একটি জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে—যেখানে ইরান সংকটের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও আংশিকভাবে নির্ধারিত হতে পারে।