ঢাকা

হরমুজ প্রণালীর টানাপোড়েনের মধ্যেও জ্বালানি সহযোগিতায় ইরান-ইরাক-পাকিস্তান উদ্যোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যখন ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন ও সীমিত প্রবেশাধিকার কাঠামোর মধ্যে চলছে, তখন ইরাক ও পাকিস্তান তেহরানের সঙ্গে পৃথক জ্বালানিচুক্তি করেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্রের বরাতে এই তথ্য প্রকাশ করে রয়টার্স। চুক্তির ফলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিরাপদ রাখার চেষ্টা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিতে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বদলে গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের গবেষক ক্লদিও স্টয়ার বলেন, সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে, যেখানে বিশ্বে মোট অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে অবরোধ আরোপ করলেও ইরান শুরুতে প্রণালি বন্ধের অবস্থান নিলেও পরে অবস্থান পরিবর্তন করে এখন প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করছে।

তার ভাষায়, “হরমুজ এখন আর নিরপেক্ষ নৌপথ নয়, এটি এখন নিয়ন্ত্রিত করিডর।”

ইরাকের সঙ্গে গোপন সমন্বিত তেল পরিবহন চুক্তি

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগদাদ ও তেহরানের মধ্যে আগে প্রকাশ না হওয়া একটি চুক্তির আওতায় গত রোববার ইরাকের দুইটি বৃহৎ তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল।

ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আরও জাহাজ চলাচলের অনুমতির জন্য এখন ইরানের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কারণ ইরাকের বাজেটের প্রায় ৯৫ শতাংশই তেল রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, ইরাক ও ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা দুই দেশের অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলবে।

আরেক কর্মকর্তা ও জাহাজ চলাচল খাতের একটি সূত্রও এই আলোচনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ইরাক সরকারের এক মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

পাকিস্তানের জন্য কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ইসলামাবাদ ও তেহরানের মধ্যে আলাদা একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পর কাতার থেকে এলএনজি বহনকারী দুটি ট্যাংকার পাকিস্তানের দিকে রওনা দিয়েছে।

শিল্প খাতের দুটি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তান বর্তমানে জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহের প্রয়োজন অনুভব করছে, বিশেষ করে গরম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়।

যুদ্ধ শুরুর আগে পাকিস্তানে মাসে প্রায় ১০টি এলএনজি কার্গো আসত, যা এখন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।

সূত্রগুলো বলেছে, এসব জাহাজ চলাচলের অনুমতির জন্য ইরান বা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) কোনো সরাসরি অর্থ প্রদান করা হয়নি।

কাতারের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় কাতার সরাসরি অংশ নেয়নি। তবে পাকিস্তানে এলএনজি পাঠানোর আগে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করা হয়েছে বলে সূত্র দাবি করেছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পাকিস্তানের জ্বালানি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো পক্ষই তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেনি।

জ্বালানি বাজারে চাপ ও আঞ্চলিক প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইরাক ও পাকিস্তানের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো বিশেষভাবে চাপের মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তেল ও এলএনজি বাজারে মূল্য অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

কৌশলগত ভারসাম্যের নতুন অধ্যায়

হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিকল্প কূটনৈতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

একদিকে সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা—এই দুইয়ের মধ্যে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ জ্বালানি রাজনীতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স