প্রতিবন্ধিতা কখনোই শিশু-কিশোরদের যোগ্য ও স্বনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধা হওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, যথাযথ চিকিৎসা, সময়োপযোগী সহায়তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোররাও তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সক্ষম হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমভিত্তিক ‘শিশুস্বর্গ মডেল’ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম। এতে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উন্নয়ন সংস্থা প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
‘শিশুস্বর্গ মডেল’ কার্যক্রমের উদ্বোধন
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, নতুন এই ‘শিশুস্বর্গ মডেল’ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো প্রতিবন্ধী শিশুদের শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, পুনর্বাসন এবং সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা। স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
জুবাইদা রহমান বলেন, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় সময়মতো চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। তিনি বলেন, এই প্রকল্প শুধু শিশুদের নয়, তাদের মায়েদের মানসিক ও সামাজিক সহায়তাও জোরদার করবে।
তিনি আরও বলেন, “আত্মবিশ্বাসই পারে বিষণ্নতার অন্ধকার থেকে মা ও শিশুকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে।”
প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ গঠনের আহ্বান
প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও সুযোগ প্রসঙ্গে জুবাইদা রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি স্থানে তাদের সহজ প্রবেশাধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ট্রেনে ও লঞ্চে ভাড়া মওকুফের মতো উদ্যোগ ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, “আমরা চাই প্রতিটি শিশু—সে বিশেষভাবে সক্ষম হলেও—তার পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠুক।”
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিশ্রুতি
অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন কেবল চিকিৎসা নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার।
তিনি জানান, দেশে প্রায় ৩৫ লাখ গুরুতর প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ গ্রামীণ ও দরিদ্র এলাকায় বসবাস করে এবং প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত।
তিনি আরও বলেন, ২০ বছরের গবেষণার ভিত্তিতে ‘শিশুস্বর্গ’ মডেল তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় শিশুদের শনাক্ত করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। প্রথম ধাপে ১০টি উপজেলা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে ৫০টি এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশব্যাপী বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নীতিগত পদক্ষেপ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য পরিবহন সুবিধা, ভবনে র্যাম্প, আলাদা ওয়াশরুম এবং সেবামূলক অবকাঠামো নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা না থাকলে হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ট্রেড লাইসেন্স না দেওয়ার মতো কঠোর নির্দেশনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের শিক্ষা, থেরাপি, মানসিক সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সরকার কাজ করছে। তিনি প্রতিবন্ধীদের প্রতি মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক নাগরিকের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা। “সবার আগে বাংলাদেশ” কেবল স্লোগান নয়, এটি সমতা ও অধিকারভিত্তিক সমাজ গঠনের দর্শন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অংশগ্রহণকারী ও উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী।
এছাড়া বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া, ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হালিম এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক আ ন ম মনোয়ারুল কাদির।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথিরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিভিন্ন শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর স্টল পরিদর্শন করেন এবং তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।