ঢাকা

সিটি নির্বাচনে সংগঠিত প্রস্তুতি, অধিকাংশ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আসন্ন সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিকভাবে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি এবার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তরুণ নেতৃত্বকে, যার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত ছাত্রনেতা ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদেরও নির্বাচনী মাঠে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

দলীয় সূত্র ও শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত। ইতিমধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করে মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তরুণ নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে জামায়াত

জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তরুণ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনা হচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলন ও ক্যাম্পাস রাজনীতিতে যুক্ত তরুণদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ প্রথম আলোকে বলেন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রার্থী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, কিছু এলাকায় ১১–দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ থাকলেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটি এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একই বিষয়ে দলটির আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঐক্যজোটভুক্ত দলগুলো নিজ নিজ প্রার্থী দেবে—এটাই আপাতত সিদ্ধান্ত।

চার সিটিতে প্রার্থী চূড়ান্ত

দলীয় সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য স্থানীয় শাখাগুলো থেকে তিন সদস্যের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা সংগ্রহ করা হয়। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে ইতিমধ্যে চারটি সিটি করপোরেশনের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চূড়ান্ত হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী আবদুল জব্বার
গাজীপুর সিটিতে হাফিজুর রহমান
চট্টগ্রাম সিটিতে শামসুজ্জামান হেলালী
রংপুর সিটিতে এ টি এম আজম খান

দলীয় দায়িত্বশীলরা জানান, এসব প্রার্থীকে সাংগঠনিকভাবে মাঠে নামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তারা ইতিমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে গণসংযোগ শুরু করেছেন।

ঢাকা দুই সিটি নিয়ে জটিলতা

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটিতে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় আছেন।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আলোচনায় রয়েছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি আবু সাদিক কায়েম।

তবে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা দেখা দিয়েছে। দলীয় নেতারা বলছেন, নির্বাচনের সময় তার সাংগঠনিক যোগ্যতা ও আইনগত অবস্থান বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে এনসিপির পক্ষ থেকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে সমর্থনের একটি প্রস্তাব এলেও জামায়াতের অভ্যন্তরে এ বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে বলে জানা গেছে।

কেন একক নির্বাচন?

জামায়াত নেতারা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে—জোটে থেকে নির্বাচনের চেয়ে আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা বেশি সাংগঠনিক সাফল্য পেয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে এগোনোর প্রস্তুতি।

দলটির দাবি, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে এবং তাদের জনসমর্থনও বেড়েছে। ফলে তারা নিজেদেরকে এখন প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।

এনসিপিও একক প্রস্তুতিতে

একই সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি ইতিমধ্যে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে এবং ধাপে ধাপে আরও প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করছে।

তবে দলটির ভেতরে এখনো ১১–দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে নির্বাচনে যাওয়ার আলোচনাও চলমান।

নির্বাচন কৌশল ও মাঠের প্রস্তুতি

জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোও নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে সাংগঠনিকভাবে ভাগ করে প্রার্থী বাছাই ও মাঠ পর্যায়ের সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, প্রার্থী যাচাইয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন সময়সূচি ঘোষণার পর নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন ও গণসংযোগ শুরু করা হবে।

দলটির আরেক নেতা জানান, ৫০ শতাংশের বেশি ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভায় সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং তাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন চায় জামায়াত

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বা অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। জামায়াতের মতে, এই অবস্থায় সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়।

তারা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন এবং প্রশাসকদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার দাবি জানিয়েছে।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হওয়া উচিত। তাই দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রস্তুতি

নির্বাচন কমিশন এখনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করেনি। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দল ও সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সময়সীমার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতির গতি বাড়ছে।

শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগত হবে নাকি এককভাবে অনুষ্ঠিত হবে—তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সমঝোতা ও নির্বাচনী পরিবেশের ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স