যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং–এর সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং তাইওয়ান ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে—তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা ভিন্ন ভিন্ন মত দিচ্ছেন।
একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে The New York Times বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় ট্রাম্পের সঙ্গে বড় কোনো নতুন চুক্তির প্রয়োজন বেইজিং হয়তো অনুভব করছে না।
চীনের ‘কৌশলগত সুবিধা’ হিসেবে ইরান সংকট
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর ট্রাম্প–সি বৈঠকে চীন বিরল খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে।
চীনের বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা বেইজিংকে কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। লি দাউকুই বলেন, ইরান ইস্যুটি চীনের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।
চীন বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। তাই মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা চীনের জন্য একদিকে ঝুঁকি হলেও অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও চীনের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র চায়, চীন যেন ইরানের প্রতি সমর্থন কমিয়ে আনে। তবে বেইজিং সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী এবং বিষয়টি মূলত ওয়াশিংটনের দায়িত্ব বলেই মনে করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন সম্ভাব্যভাবে কেবল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ খোলা রাখার বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারে। কারণ এই পথে চীনের তেল আমদানির বড় অংশ নির্ভরশীল।
একই সঙ্গে বেইজিং চাইতে পারে যুক্তরাষ্ট্র যেন ওই সমুদ্রপথে কোনো অবরোধমূলক পদক্ষেপ না নেয়।
তাইওয়ান ইস্যু: মূল আলোচ্য চাপ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় চীনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত লক্ষ্য হতে পারে তাইওয়ান ইস্যু।
চীন চায় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের প্রতি সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন সীমিত করুক। এর মধ্যে অস্ত্র বিক্রি হ্রাস বা বিলম্ব করানোর মতো বিষয়ও থাকতে পারে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির কিছু অংশ স্থগিত করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি তাইওয়ান–সংক্রান্ত বিষয় চীনের সঙ্গে আলোচনায় তুলতে পারেন—যা দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির একটি বড় পরিবর্তন হতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমন পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে তা চীনের জন্য কূটনৈতিক বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
চীনা শিক্ষাবিদদের মতে, ইরান সংকট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এর ফলে পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে বেইজিংয়ের কট্টরপন্থী বিশ্লেষকরা।
উ জিনবো মন্তব্য করেছেন, ইরান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি বড় যুদ্ধ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা
বিশ্লেষণে বলা হয়, চীন এই বৈঠককে শুধু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের নতুন কাঠামো নির্ধারণের সুযোগ হিসেবে দেখছে।
বেইজিং চায়, নিজেদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের সমান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। এতে দুই দেশের সম্পর্ক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সহাবস্থানযোগ্য’ কাঠামোয় চলে যেতে পারে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম Xinhua News Agency–এর সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়তেও বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক দ্বিমুখী সুবিধার ভিত্তিতে হওয়া উচিত, একতরফা চাপের ভিত্তিতে নয়।
অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রযুক্তি যুদ্ধ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি, চিপ উৎপাদন, এআই এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
চীন বর্তমানে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জবাবে দেশটি নিজস্ব চিপ ও এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় চীন পাল্টা অর্থনৈতিক পদক্ষেপও নিয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতিকে আরও বাড়িয়েছে।
চীনের কৌশল: স্থিতিশীলতা, সময় ও সুবিধা
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মূল লক্ষ্য এখন বড় কোনো দ্রুত চুক্তি নয়, বরং সময় নেওয়া এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।
আমান্ডা সিয়াও বলেন, বেইজিং এখন স্থিতিশীলতা চায়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা যায়।
চীন একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বজায় রাখতে পারে—যেমন বিমান, সয়াবিন ও মাংস আমদানি—যা কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় চীন নিজেদেরকে এমন অবস্থানে দেখতে চাইছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও নিয়ন্ত্রিত। তাই বড় কোনো নতুন চুক্তির পরিবর্তে কৌশলগত সময়ক্ষেপণ ও প্রভাব বিস্তারই বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে।