মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে পরিচালিত সাম্প্রতিক শারীরিক পরীক্ষার পর তাঁর চিকিৎসক ড. শন পি. বারবাবেলা তিন পাতার একটি স্বাস্থ্য প্রতিবেদন তৈরি করেন, যা গত শুক্রবার প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে ট্রাম্পের সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাকে ‘চমৎকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তাঁর ওজন বৃদ্ধি, কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা পরামর্শ বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
‘চমৎকার স্বাস্থ্য’ দাবি, তবে রয়েছে কিছু সতর্কতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৯ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, স্নায়ুতন্ত্র এবং সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা স্বাভাবিক ও শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে।
চিকিৎসক ড. বারবাবেলা উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের জন্য যথেষ্ট উপযোগী। তবে একই সঙ্গে কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং জীবনযাপনে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার ঝুঁকি
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর থেকে ট্রাম্পের ওজন ১৪ পাউন্ড বেড়েছে। বর্তমানে তাঁর ওজন ২৩৮ পাউন্ড, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ড অনুযায়ী স্থূলতার (obesity) সীমার কাছাকাছি।
চিকিৎসকেরা তাঁকে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রম বৃদ্ধি এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্টকে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য নির্দেশনার অংশ হিসেবে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
কোলেস্টেরল ও হৃদ্স্বাস্থ্যের ইতিহাস
ট্রাম্পের দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তিনি বর্তমানে এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল) নিয়ন্ত্রণে ক্রিস্টর ও জেটিয়া নামের ওষুধ গ্রহণ করছেন।
এছাড়া হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে তিনি নিয়মিত উচ্চমাত্রার অ্যাসপিরিন সেবন করছেন। তবে চিকিৎসকদের সাধারণ সুপারিশ অনুযায়ী কম মাত্রার অ্যাসপিরিন গ্রহণের পরামর্শ তিনি গ্রহণ করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
গত বছর তাঁর হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম আরও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণের পর ‘ক্রনিক ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সি’ নামের একটি রক্ত সঞ্চালনজনিত সমস্যা শনাক্ত হয়।
স্নায়বিক পরীক্ষা: পূর্ণ নম্বর
ওয়াল্টার রিড হাসপাতালে ট্রাম্পের স্নায়বিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ‘মন্ট্রিয়ল কগনিটিভ অ্যাসেসমেন্ট (MoCA)’ পরীক্ষা করা হয়, যা ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প এই পরীক্ষায় পূর্ণ ৩০-এর মধ্যে ৩০ পেয়েছেন, যা তাঁর স্নায়বিক কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক থাকার ইঙ্গিত দেয়।
ফোলাভাব, কালশিটে ও ওষুধজনিত প্রভাব
প্রতিবেদনে ট্রাম্পের শরীরে সাম্প্রতিক কিছু শারীরিক পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাতে কালশিটে দাগ এবং পায়ের নিচের অংশে সামান্য ফোলাভাব রয়েছে।
চিকিৎসকের ব্যাখ্যায় বলা হয়, এসব লক্ষণ অ্যাসপিরিন থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা সাধারণত গুরুতর নয়।
এছাড়া ট্রাম্পের শরীরের নিচের অংশে ফোলাভাব আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চলতি বছরের শুরুতে তাঁর ঘাড়ে এক ধরনের চর্মরোগ বা র্যাশ দেখা গিয়েছিল, যা স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত ওষুধ ক্রিম দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে নতুন প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
চিকিৎসা পরামর্শ: জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের আহ্বান
ড. বারবাবেলা প্রতিবেদনে ট্রাম্পকে কয়েকটি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে—
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা
শারীরিক পরিশ্রম বৃদ্ধি করা
অ্যাসপিরিনের ডোজ কমানো
ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা
চিকিৎসকের ভাষায়, এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য বিতর্ক
মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ট্রাম্পের স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে আলোচনা রয়েছে।
এর আগেও তাঁর চিকিৎসকেরা একাধিকবার তাঁর স্বাস্থ্যকে ‘অসাধারণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশিত তথ্যকে অসম্পূর্ণ বা অতিরিক্ত ইতিবাচক হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছে।
২০১৮ সালে তাঁর তৎকালীন চিকিৎসক রনি জ্যাকসন মন্তব্য করেছিলেন, উন্নত জীবনযাপন থাকলে ট্রাম্প ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারতেন—যা তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সাম্প্রতিক এই স্বাস্থ্য প্রতিবেদন একদিকে ট্রাম্পের শারীরিক সক্ষমতার ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরলেও, অন্যদিকে তাঁর ওজন বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং জীবনযাপনের সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমান অবস্থায় তিনি দায়িত্ব পালনে সক্ষম হলেও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন অপরিহার্য।