ঢাকা

৮৮ দিন পর ইন্টারনেট চালু ইরানে, সংঘাতের আগুন এখনো জ্বলছে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রয়টার্স

তেহরান–দুবাই

টানা ৮৮ দিনের অচলাবস্থার পর অবশেষে ইরানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় সচল করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দীর্ঘ এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট শেষ হলেও, একই সময়ে দেশটিতে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, সোমবার প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ পুনরায় চালুর নির্দেশ দেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে দেশটির বাইরে ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

দীর্ঘ ব্ল্যাকআউট শেষে সংযোগ ফেরানো

৮৮ দিন ধরে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা ইরানের নাগরিকদের জন্য এই সিদ্ধান্তকে বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই স্বস্তির মাঝেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, কারণ কর্তৃপক্ষ এখনো সম্পূর্ণ ডিজিটাল স্বাধীনতা ফেরানোর বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।

ইন্টারনেট পুনরায় চালুর খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিয়ান গালভানি নামের এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ লেখেন, “টেলিগ্রামের নোটিফিকেশন দেখে জীবনে কখনো এতটা খুশি হইনি।”

কেন বন্ধ ছিল ইন্টারনেট

বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকার দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বজায় রেখেছিল। বিভিন্ন সময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা HRANA জানিয়েছে, ৮ জানুয়ারি দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। সেই বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানির দাবি করা হয়।

পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারিতে সংযোগ আংশিকভাবে ফিরলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পরিস্থিতি আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দেশব্যাপী ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

যুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি হামলার উত্তেজনা

ইন্টারনেট পুনরায় চালুর সময়েই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দেয়। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ওঠে। এর জবাবে ইরানের বন্দর আব্বাস এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা যুদ্ধবিরতির স্থিতিশীলতাকে আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের অবস্থান

ইরানের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী সাইয়্যেদ সাত্তার হাশেমি বলেন, “ইরানের জনগণের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে মুক্ত যোগাযোগের অধিকার রয়েছে। একটি গতিশীল অর্থনীতি ও উন্মুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সরকারের অগ্রাধিকার।”

তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দেশের ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন।

অর্থনীতি ও ব্যবসায় ক্ষতি

দীর্ঘ ৮৮ দিনের ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে এনেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অনেক ব্যবসায়ী ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে পণ্য বিক্রি করতেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে থেমে যায়।

একজন ক্ষতিগ্রস্ত প্রোগ্রামার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনেকে ঋণের টাকায় ব্যবসা চালাতেন। এই ব্ল্যাকআউটে তারা সবকিছু হারিয়েছেন। এখন শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।”

ধীরগতির পুনরুদ্ধার আশঙ্কা

ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, সংযোগ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীরগতির হতে পারে এবং কিছু অঞ্চলে পুরোপুরি পরিষেবা ফিরতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহও লাগতে পারে।

সংস্থাটির পরিচালক আল্প টোকার বলেন, “এখনো অনেক জায়গায় ভিপিএন ছাড়া আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যাচ্ছে না। মানুষ বাস্তবিক অর্থে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।”

অনিশ্চয়তার মধ্যে জনগণ

ইন্টারনেট ফিরে এলেও ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো আস্থার ঘাটতি রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে আবারও ইন্টারনেট সীমিত করা হতে পারে।

একজন নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “আমরা এখনো বিশ্বমানের ইন্টারনেট থেকে অনেক দূরে। এই অন্ধকারের মধ্যে বেঁচে থাকাই এখন আমাদের বাস্তবতা।”



৮৮ দিনের দীর্ঘ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট শেষে ইরান আবার বৈশ্বিক যোগাযোগে ফিরলেও, একই সময়ে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য না এলে এই স্বাভাবিকতা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স