বিশ্বজুড়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রি এবং আত্মহত্যায় সহায়তার অভিযোগে কানাডায় এক ব্যক্তি দোষ স্বীকার করেছেন। ৬০ বছর বয়সী কেনেথ এল নামের ওই সাবেক শেফ অন্টারিওর একটি আদালতে ১৪টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
আদালতে তিনি কৌঁসুলিদের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে দোষ স্বীকার করেন। এর বিনিময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আনা আরও গুরুতর হত্যার অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
এই মামলাকে কেন্দ্র করে অনলাইন নিরাপত্তা, আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং সীমান্তপারের অপরাধ তদন্ত নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অনলাইনে বিষ বিক্রি ও বিশ্বব্যাপী বিস্তার
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, কেনেথ এল অনলাইন ফোরাম ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আত্মহত্যা-সংক্রান্ত বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতেন। এরপর তিনি বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের প্যাকেট বিক্রি করতেন।
প্রায় ১ হাজার ২০০টি এমন প্যাকেট বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশে পাঠানো হয়। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যেই সবচেয়ে বেশি—প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
যদিও তিনি কানাডার আদালতে কেবল দেশটির ভুক্তভোগীদের বিষয়ে দায় স্বীকার করেছেন, তদন্তে উঠে এসেছে যে তাঁর কার্যক্রম ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত।
গ্রেপ্তার ও আন্তর্জাতিক তদন্ত অভিযান
কেনেথ এল-কে ২০২৩ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে অংশ নেয় মোট ১১টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, যার মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালিসহ প্রায় এক ডজন দেশের তদন্তকারী দল ছিল।
গ্রেপ্তারের আগে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম টাইমস একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে অভিযোগ করা হয় যে তিনি তরুণদের কাছে বিষ বিক্রি করছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন সাংবাদিক ক্রেতা সেজে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি পণ্য ব্যবহারের পদ্ধতি এবং কীভাবে ‘মৃত্যু নিশ্চিত করার সম্ভাবনা বেশি’—সে বিষয়ে পরামর্শ দেন।
ভুক্তভোগী ও পরিবারগুলোর বেদনা
মামলায় কানাডার একাধিক ভুক্তভোগীর নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম অ্যাশটিন প্রোসার ব্লেক, যিনি ২০২৩ সালের মার্চে ১৯ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন।
তার মা কিম প্রোসার জানান, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে তার ছেলের মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। তিনি কলেজে ভর্তি হলেও এক বছর পর পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং পরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
ছেলের মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচার বা শাস্তি তার সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তাঁর ভাষায়, “কাউকে কারাগারে পাঠালেই আমার ছেলেকে হারানোর কষ্ট কমে যাবে না।”
আইনি দিক ও অভিযোগ প্রত্যাহার
কানাডার ফৌজদারি আইনে আত্মহত্যায় সহায়তার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
প্রসিকিউশনের সঙ্গে সমঝোতার ফলে কেনেথ এল-এর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর হত্যার অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। তবে আত্মহত্যায় সহায়তার ১৪টি অভিযোগে তিনি দোষ স্বীকার করেছেন।
তাঁর সাজা নির্ধারণের শুনানি আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর শুরু হবে এবং কয়েক দিন ধরে চলবে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
অনলাইন নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে নতুন বিতর্ক
এই মামলাকে ঘিরে অনলাইনে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিপজ্জনক পদার্থ বিক্রির বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত অতিক্রমকারী ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসগুলোতে নজরদারি না থাকলে এমন অপরাধ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে।
একই সঙ্গে আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কেনেথ এল-এর দোষ স্বীকার কেবল একটি ফৌজদারি মামলার সমাপ্তি নয়, বরং এটি অনলাইন অপরাধ, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার একটি কঠিন উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই নেটওয়ার্ক কীভাবে এতদিন নজরদারির বাইরে ছিল—সেই প্রশ্ন এখনো খোলা রয়ে গেছে।