আইটিবিপি প্রধানের মুখে সীমান্তে চীনা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের কথা, কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্যে অস্থিরতার স্বীকারোক্তি; পুরোনো অস্ত্রের আধুনিকায়ন ও ড্রোন মোতায়েন বাড়ানোর তাগিদ
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের চীন সীমান্তে উত্তেজনা ও চীনা সেনাদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভারতের ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)-এর মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুরের বক্তব্য এবং দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের পর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের উচ্চ সুবানসিরি জেলার টাকসিং এলাকার কাছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ভারতের দাবি করা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থান নিয়েছে।
তবে এই দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য নিশ্চিতকরণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই। ফলে চীনা বাহিনী সত্যিই ভারতের ভূখণ্ডের ৬–৭ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্তে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান এবং ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর চীনা বাহিনী নির্ধারিত টহলপদ্ধতি থেকে সরে এলে মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতে রাজনৈতিক বিতর্কও জোরালো হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন এবং চীনের বিষয়ে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান না নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে পুরোনো অস্ত্রের আধুনিকায়ন, ড্রোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং উন্নত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন আইটিবিপি প্রধান।
অরুণাচল সীমান্তে অস্থিরতার কথা স্বীকার করল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ভারত ও চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান এবং যেকোনো ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে কূটনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে।
সীমান্ত পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, চীনা বাহিনী নির্ধারিত টহলপদ্ধতি থেকে সরে এলে মাঝেমধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। তাঁর বক্তব্যে সীমান্তে টহল ও অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
জয়সোয়াল আরও বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নত করার লক্ষ্যে উপযুক্ত এলাকাগুলোতে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে পারস্পরিক ধারণা ও বোঝাপড়া বাড়াতে দুই পক্ষ আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ভারত-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
তবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য জানা যায়নি। ফলে অরুণাচল সীমান্তে চীনা বাহিনীর অবস্থান নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগের বিষয়ে বেইজিংয়ের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে সীমান্তে উত্তেজনা ও টহলসংক্রান্ত মতবিরোধের বিষয়টি উঠে এলেও চীনা বাহিনী ভারতের ভূখণ্ডের ৬–৭ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থান করছে—এমন নির্দিষ্ট দাবি নিশ্চিত করা হয়নি।
আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় আইটিবিপির মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুরের বক্তব্যের পর। বৃহস্পতিবার রাজস্থানের আলোয়ারে সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে (সিটিসি) আইটিবিপি কর্মীদের বার্ষিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে চীনা সেনাদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের সময় আইটিবিপির সদ্য গঠিত ‘শৌর্য কমান্ডো ইউনিট’ নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছে।
কাপুরের বক্তব্য অনুযায়ী, অরুণাচল সীমান্তে চলমান পরিস্থিতিতে আইটিবিপি কমান্ডোরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সদ্য গঠিত শৌর্য কমান্ডোরা দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখছে। আইটিবিপিকে মূলত একটি পার্বত্য গেরিলা বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। ২০০৪ সালে আমাদের চীন সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রচলিত কাঠামোর বাইরে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনায় সক্ষম একটি বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে। শিগগিরই শৌর্য কমান্ডোদের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে বলেও জানান তিনি।
কাপুরের ভাষায়, অত্যন্ত উচ্চতায় মোতায়েন থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করাই আইটিবিপির অন্যতম শক্তি। তবে তাঁর বক্তব্যে সীমান্তের নির্দিষ্ট কোন কোন স্থানে চীনা সেনাদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে আইটিবিপি মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুরের।
টাকসিংয়ের কাছে ৬–৭ কিলোমিটার ভেতরে চীনা সেনাদের অবস্থানের দাবি
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সরকারি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে অরুণাচল প্রদেশের টাকসিংয়ের কাছে আসাফিলা এলাকায় ভারত ও চীনের সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সদস্যরা ভারতের ধারণা করা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে উচ্চতর স্থানে অবস্থান নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ সুবানসিরি জেলার টাকসিং সার্কেলের মাঞ্জা কোম্পানি অপারেটিং বেসের কাছে তাঁবু স্থাপন করেছে চীনা বাহিনী।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সূত্রের দাবি, জুলাই মাসের কোনো এক সময়ে নিয়মিত টহলের সময় টাকসিং গ্রামের সদর এলাকার কাছাকাছি মাঞ্জায় ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। সংক্ষিপ্ত বিরোধের পর দুই পক্ষের সেনারা সেখান থেকে সরে যায়। তবে কয়েক দিন পর চীনা বাহিনী বেশি সংখ্যায় ফিরে আসে এবং ভারতের দাবি করা এলএসি থেকে প্রায় ৬–৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করে।
এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারাও একই ধরনের দাবি করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। টাকসিংয়ের এক সাংবাদিকের বক্তব্য অনুযায়ী, চীনা সেনারা ভারতের ভেতরে বেশ খানিকটা ঢুকে পড়েছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
তবে এসব তথ্য সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত সূত্র ও স্থানীয়দের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত। চীনা সেনাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, সংশ্লিষ্ট এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তরেখার প্রকৃত অবস্থান স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা না গেলে ৬–৭ কিলোমিটার অনুপ্রবেশের দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
এর আগে আগস্টের শেষ দিকে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ রিজিজু চীনা সেনারা ভারতের ভূখণ্ডে ৬০ কিলোমিটার ঢুকে পড়েছে—এমন প্রচারকে মিথ্যা বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে সীমান্ত অঞ্চলে কিছু সমস্যা রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেছিলেন। ফলে সীমান্তে সমস্যা থাকার বিষয়টি এবং চীনা সেনাদের নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত অনুপ্রবেশের দাবি—দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
পুরোনো অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ, ড্রোনে বিনিয়োগের তাগিদ
আইটিবিপি প্রধান শত্রুজিৎ কাপুরের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাহিনীর অস্ত্র ও সরঞ্জামের আধুনিকায়ন। তিনি বলেছেন, সীমান্তে আইটিবিপির ব্যবহৃত কিছু অস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। বর্তমান যুদ্ধের ধরন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে এসব অস্ত্রের আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
কাপুরের মতে, চীনের অস্ত্র ও সীমান্ত অবকাঠামো আধুনিকায়নে বিপুল বিনিয়োগের কারণে ভারতেরও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করা সব পরিস্থিতিতে কার্যকর নাও হতে পারে।
এ কারণে ড্রোনের মতো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেন ও ইরানের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, তুলনামূলক ছোট শক্তিও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় প্রতিপক্ষের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
আইটিবিপি প্রধান জানান, আধুনিকায়নের জন্য বরাদ্দ তহবিলের একটি বড় অংশ ড্রোনের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে। সীমান্ত নজরদারি, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং উচ্চ পার্বত্য এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
চীন সীমান্তে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে আগামী তিন বছরে ভূমির ওপর নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রের সমপরিমাণ ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান কাপুর। আধুনিক যুদ্ধে সেনাদের নিরাপদ অবস্থান, প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকা এবং আক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য এসব স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
আইটিবিপির অস্ত্রের বয়স ও আধুনিকায়ন নিয়ে তাঁর মন্তব্য ভারতে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীর সরঞ্জাম যদি পুরোনো হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো আধুনিকায়নে সরকারের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর ছিল।
কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে আলোচনা চলছেই
সীমান্তে উত্তেজনার খবরের মধ্যেও ভারত ও চীন সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তবিষয়ক ‘ওয়ার্কিং মেকানিজম ফর কনসালটেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন’ বা ডব্লিউএমসিসির ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৬ আগস্ট।
এরপর ২৬ আগস্ট বেইজিংয়ে দুই দেশের সীমান্তবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধিদের ২৫তম দফার আলোচনা হয়। বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল।
এ ছাড়া ৬ সেপ্টেম্বর পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরে দুই দেশের সেনাবাহিনীর কোর কমান্ডার পর্যায়ে প্রথমবারের মতো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব বৈঠকের উদ্দেশ্য সীমান্তে অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনা, ভুল-বোঝাবুঝি কমানো এবং সংঘাত এড়ানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তবে ধারাবাহিক আলোচনার পরও অরুণাচল সীমান্তে অবস্থানসংক্রান্ত অভিযোগ সামনে আসায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্তের বেশ কিছু অংশে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার অবস্থান নিয়ে পারস্পরিক ধারণার পার্থক্য রয়েছে। ফলে এক পক্ষের নিয়মিত টহল অন্য পক্ষের কাছে অনুপ্রবেশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সুনির্দিষ্ট অবস্থান, দুই দেশের দাবি এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন।
আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর কংগ্রেসের সমালোচনা
আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। দলটির সংসদ সদস্য জয়রাম রমেশ অভিযোগ করেছেন, চীনের বিষয়ে সরকার যথেষ্ট স্বচ্ছতা দেখাচ্ছে না এবং অরুণাচল সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, লাদাখের মতো অরুণাচল প্রদেশেরও কয়েকটি টহল-বিন্দুতে ভারতের নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে এবং চীন অরুণাচলের বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তন করে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
জয়রাম রমেশ আরও দাবি করেন, চীন ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বাঁধ নির্মাণ করছে, যা ওই অঞ্চলের পরিবেশ ও পানির নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
তবে কংগ্রেসের এসব বক্তব্য বিরোধী দলের অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। টহল-বিন্দুর নিয়ন্ত্রণ, চীনের বাঁধের সম্ভাব্য প্রভাব এবং সীমান্তে অনুপ্রবেশের মতো বিষয়গুলো যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য ও স্বাধীন প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ভারতের অরুণাচল প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
সীমান্তের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে
অরুণাচল প্রদেশের টাকসিং ও আসাফিলা এলাকায় চীনা বাহিনীর অবস্থান নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন, আইটিবিপি প্রধানের মুখোমুখি অবস্থানের বক্তব্য এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্তে অস্থিরতার স্বীকারোক্তি—সব মিলিয়ে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে চীনা বাহিনী ভারতের ভূখণ্ডে ঠিক কতটা ভেতরে প্রবেশ করেছে, কোন স্থানগুলোতে দুই দেশের সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে এবং সেখানে বর্তমানে কারা কী অবস্থানে আছে—এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ৬–৭ কিলোমিটার অনুপ্রবেশের দাবি এবং স্থানীয়দের বক্তব্য পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরলেও সেগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আইটিবিপির অস্ত্র আধুনিকায়ন, ড্রোনে বিনিয়োগ এবং বাঙ্কার নির্মাণের পরিকল্পনা দেখাচ্ছে, ভারত সীমান্ত নিরাপত্তায় প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আর কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও সীমান্তের অমীমাংসিত বিষয়গুলো এখনো দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।