দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করে প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো কৌশলগত বিউফোর্ট দুর্গ দখল করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দখলকে ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবাননে চলমান সামরিক অভিযানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দখলের পর দুর্গে ইসরায়েলি পতাকা ও গোলানি ব্রিগেডের পতাকা উত্তোলন করা হয় বলে নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, যা এএফপি যাচাই করেছে। ভিডিওতে আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় গোলাবর্ষণ, বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়, যা তীব্র সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয়।
কৌশলগত অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ
মধ্যযুগীয় বিউফোর্ট দুর্গ, স্থানীয়ভাবে ‘কালাত আল–শাকিফ’ নামে পরিচিত, দক্ষিণ লেবাননের একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি পুরো দক্ষিণ লেবাননের বড় একটি অংশের ওপর নজরদারির সুবিধা দেয়, যা সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্গ দখলের মাধ্যমে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে নজরদারি ও আক্রমণ সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করেছে।
ইসরায়েলের দাবি: হিজবুল্লাহ অবকাঠামো লক্ষ্য
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননের বিউফোর্ট হাইটস ও ওয়াদি আল–সালুকি এলাকায় অভিযান চালিয়ে হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংস করছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই অঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি ভূখণ্ডে রকেট হামলা চালাত।
সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, লিতানি নদী অতিক্রম করে তারা এমন কিছু অবস্থান দখল করেছে, যেখান থেকে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হচ্ছিল।
২৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গভীর অনুপ্রবেশ
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত প্রায় ২৬ বছরে দক্ষিণ লেবাননের এত গভীরে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রবেশ এই প্রথম। সাম্প্রতিক অভিযানে সীমান্ত পেরিয়ে লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে আরও অভ্যন্তরে অগ্রসর হয়েছে তারা।
এই অগ্রগতিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের একটি বড় মোড় হিসেবে দেখছেন সামরিক পর্যবেক্ষকরা।
নাবাতিয়েহ ঘিরে নতুন উত্তেজনা
ইসরায়েলি বাহিনী এখন দক্ষিণ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ শহর নাবাতিয়েহ ঘিরে ফেলার কৌশলগত প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই শহরটি শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
শহরের আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল দখলে এলে পশ্চিম বেকা উপত্যকা ও দক্ষিণ লেবাননের বড় অংশে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা সম্ভাব্য বড় অভিযানের আশঙ্কায় এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে শুরু করেছেন।
যুদ্ধবিরতি ভঙ্গুর অবস্থায়
গত ১৭ এপ্রিল ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও শুরু থেকেই তা কার্যত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে নিয়মিত হামলা ও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললেও ইসরায়েল বলছে, তারা আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে অভিযান চালাচ্ছে।
হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলা
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে রকেট হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। বিশেষ করে কিরিয়াত শমোনা ও সীমান্তবর্তী সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, হামলার পর বেসামরিক নাগরিকরা নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছেন।
আঞ্চলিক রাজনীতি ও বড় শক্তিগুলোর ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ধীরগতিতে এগোনোর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি কৌশলগত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অভিযান জোরদার করছে।
ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যে এই সংঘাত এখন আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-এর মধ্যস্থতায় সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার কথাও চলছে, তবে এর ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
লেবানন সরকারের অভিযোগ
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে গ্রাম ও শহর ধ্বংস করছে এবং স্থানীয় জনগণকে বাস্তুচ্যুত করছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে “পোড়ামাটি নীতি” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সামরিক অভিযান নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা কোনো কিছুই নিশ্চিত করতে পারবে না, বরং সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হবে।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিউফোর্ট দুর্গ দখল কেবল একটি সামরিক সাফল্য নয়, বরং দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাতকে আরও দীর্ঘ ও জটিল পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতির ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।