ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের আরেক সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ওপর হামলার একদিন পরই নতুন এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
আজ রোববার হুগলি জেলার চণ্ডীতলায় নিজের নির্বাচনী এলাকায় হামলার শিকার হন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ভারতীয় জনতা পার্টি এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ঘটনাস্থল: চণ্ডীতলায় কী ঘটেছিল
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভোট-পরবর্তী সহিংসতা সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সকালে সমর্থকদের সঙ্গে থানায় যাচ্ছিলেন। চণ্ডীতলা এলাকা শ্রীরামপুর লোকসভা আসনের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পথে যানজটে গাড়ি আটকে গেলে তিনি পায়ে হেঁটে এগোতে থাকেন। ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ করে একদল লোক স্লোগান দিতে দিতে তাঁর দিকে এগিয়ে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি ট্রাকের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় পেছন দিক থেকে তাঁর মাথায় আঘাত লাগে। আঘাতের পর তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং মাথা চেপে ধরেন। আশপাশের পুলিশ সদস্যরা তখন দ্রুত ভিড় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
আঘাতের ফলে তাঁর মাথা থেকে রক্তপাত হতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর তিনি উঠে দাঁড়ালেও ভারসাম্য রাখতে সমস্যায় পড়েন। পরে মাথায় ব্যান্ডেজ ও সাদা কাপড় বাঁধা অবস্থায় তাঁকে সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, তাঁকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয় এবং এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টা। তিনি এ ঘটনার জন্য সরাসরি বিজেপিকে দায়ী করেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “হঠাৎ করে ১০–১৫ জন দুষ্কৃতী এসে স্লোগান দিতে শুরু করে। এরপরই আমার মাথায় পাথর ছোড়া হয়। আমি রাস্তায় পড়ে যাই। পরে সিআরপিএফ আমাকে উদ্ধার করে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখেনি এবং তারা “নীরব দর্শকের” ভূমিকা পালন করেছে।
অন্যদিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না এলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
অভিষেকের ঘটনার পর ধারাবাহিক উত্তেজনা
এর আগের দিনই দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে হামলার শিকার হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করে, দলীয় কর্মীদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে।
তবে বিজেপি পাল্টা অভিযোগ করে দাবি করেছে, ঘটনাগুলো রাজনৈতিকভাবে সাজানো এবং তৃণমূল নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিষয়টি ব্যবহার করছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অভিষেকের দিকে ধাক্কাধাক্কি, কিল-ঘুষি এবং ডিম নিক্ষেপ করা হচ্ছে—যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
রাজ্য রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা
পরপর দুই দিনের মধ্যে দুই শীর্ষ তৃণমূল নেতার ওপর হামলার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে এই সহিংসতা দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ছে এবং ছোট ছোট সংঘর্ষ বড় রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিচ্ছে।
তদন্ত ও পরবর্তী পরিস্থিতি
ঘটনার পর পুলিশ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দোষীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক হামলার ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক পরিবেশ—উভয়কেই নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।