দিল্লি
ভারতের কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রের ছেলে রাইহান রাজীব ভদ্রের আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে শেষ মুহূর্তে ১০৫টি ছবির মধ্যে ৭৪টি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লির বিকানির হাউস কর্তৃপক্ষ। প্রদর্শনী শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে দেওয়া এ নির্দেশকে কেন্দ্র করে ভারতে শিল্পের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাইহানের ‘নো আইডিয়া ইজ ফাইনাল’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি বুধবার নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া গেটের কাছে বিকানির হাউসে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রদর্শনী শুরুর আগে কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ ছবি সরিয়ে দিতে বলায় পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয় তাঁকে। রাইহানের ভাষ্য অনুযায়ী, সরিয়ে নেওয়া ছবিগুলোর মধ্যে গত ছয় মাসে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় তোলা আলোকচিত্রও ছিল। এমনকি জাতীয় পতাকা থাকা কিছু ছবিও বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে রাইহানের মা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের তরুণদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা কার্তি চিদম্বরমও ঘটনাটিকে সেন্সরশিপ হিসেবে উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তবে বিকানির হাউস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
প্রদর্শনী শুরুর তিন ঘণ্টা আগে আপত্তি
২৬ বছর বয়সী রাইহান রাজীব ভদ্র পেশাদার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। ছবি তোলা তাঁর আগ্রহের জায়গা, আর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর আলোকচিত্র প্রদর্শনীও হয়েছে। এবারের প্রদর্শনীতে বন্য প্রাণী, গণআন্দোলন ও বিমূর্ত চিত্রকল্পের ছবি রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
রাইহানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রদর্শনীর নকশা বা বিন্যাসের পরিকল্পনা তিনি গত ১৫ অক্টোবর কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু প্রদর্শনীর আগের দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে কর্তৃপক্ষ প্রথম আপত্তির কথা জানায়। তখন বলা হয়েছিল, বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
পরদিন বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে আপত্তি জানায়। তখন প্রদর্শনী শুরু হতে আর মাত্র তিন ঘণ্টা বাকি ছিল। রাইহান বলেন, তাঁকে আধা ঘণ্টার মধ্যে ৭৪টি ছবি সরিয়ে নিতে বলা হয়।
কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণ হিসেবে ছবিগুলোর বিষয়বস্তু ও সময়কালের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন রাইহান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, ছবিগুলো স্পষ্টতই রাজনৈতিক এবং শহরের পরিস্থিতির কারণে সেগুলো প্রদর্শনের উপযুক্ত সময় এটি নয়।
রাইহানের অভিযোগ, প্রদর্শনীর আগে প্রতিটি ছবি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হবে কিংবা সব ছবি আগেই অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হবে—এমন কোনো নির্দেশ তাঁকে দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রদর্শনীর নকশা পাঠানোর পরও এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো আপত্তি জানানো হয়নি বলে তাঁর দাবি।
ছবি সরানোর পর ফাঁকা ফ্রেম নিয়েও আপত্তি
৭৪টি ছবি সরিয়ে নেওয়ার পরও পরিস্থিতির অবসান হয়নি। রাইহানের ভাষ্য অনুযায়ী, ছবিগুলো সরানোর ফলে দেয়ালে যেসব ফ্রেম খালি হয়ে গিয়েছিল, সেগুলোও প্রদর্শনীস্থলে রাখা যাবে না বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। পরে সেসব ফ্রেমও সরিয়ে নিতে হয়।
রাইহান বলেন, শেষ মুহূর্তে এতগুলো ছবি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশে প্রদর্শনীর মূল পরিকল্পনাই বদলে যায়। যেসব ছবি বাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে জাতীয় পতাকা থাকা ছবিও ছিল বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রাইহান বলেন, জাতীয় পতাকা থাকা ছবি সরানোর নির্দেশে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নিজে সেসব ছবি নামাতে রাজি হননি। পরে তিনি সেখান থেকে চলে গেলে কর্তৃপক্ষের লোকজন ছবিগুলো সরিয়ে দেয়।
ঘটনাটিকে তিনি শিল্পের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, শিল্পকর্মের ওপর বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়। যত বিধিনিষেধই আরোপ করা হোক, শিল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথ খুঁজে নেয়।
‘আন্দোলনের ভেতর থেকে’ তোলা ছবি
রাইহানের প্রদর্শনীতে বাদ পড়া ছবিগুলোর একটি বড় অংশ ছিল বিভিন্ন গণআন্দোলনের সময় তোলা। তিনি জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে আন্দোলনগুলো পর্যবেক্ষণ করে ক্যামেরায় সেই অভিজ্ঞতা ধারণ করেছেন। আন্দোলনকে দূর থেকে দেখার বদলে তার ভেতরে থেকে মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
রাইহানের ভাষায়, ক্যামেরার লেন্স দিয়ে আন্দোলনকে তিনি যেভাবে দেখেছেন, তা অন্যদেরও দেখাতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে আন্দোলনের ভেতরে থেকে ছবি তোলার অভিজ্ঞতা আলাদা; সে অভিজ্ঞতায় ছবি কখনো কখনো কবিতার মতো হয়ে ওঠে।
এই ছবিগুলো সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ তাঁর শিল্পচর্চার পাশাপাশি প্রদর্শনীর মূল ভাবনাকেও প্রভাবিত করেছে। রাইহানের বক্তব্য, শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু ও তার বিন্যাস নিয়ে তাঁর কাজ করার পদ্ধতি এবার আগের চেয়ে আলাদা ছিল। আগে তিনি একটি নির্দিষ্ট আখ্যান তৈরি করে সেই অনুযায়ী শিল্পকর্ম সাজাতেন। এবার প্রথমে শিল্পকর্মগুলো সাজিয়েছেন, পরে সেগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আখ্যান তৈরির চেষ্টা করেছেন।
তাঁর মতে, শিল্পকর্মের অর্থ ও ব্যাখ্যা সব সময় একটিমাত্র নির্দিষ্ট বয়ানে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই প্রদর্শনীর ছবিগুলোকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও নান্দনিক বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ থাকা উচিত।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সমালোচনা
ছবি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের বিষয়ে সংবাদ সংস্থা পিটিআই প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রের মতামত জানতে চাইলে তিনি সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, সিদ্ধান্তটি হাস্যকর। তিনি বলেন, দেশের তরুণদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে; আজ রাইহানের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, আগামীকাল অন্য কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রেও তা ঘটতে পারে।
কংগ্রেস নেতা কার্তি চিদম্বরমও এ ঘটনার সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে সেন্সরশিপ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং কর্তৃপক্ষের আচরণকে অবিবেচনাপ্রসূত ও অমার্জনীয় বলে মন্তব্য করেন।
তবে এসব সমালোচনা মূলত প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিকানির হাউস কর্তৃপক্ষ কেন প্রদর্শনীর এতগুলো ছবি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে সিদ্ধান্তটির পেছনে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কারণ কী ছিল, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিকানির হাউসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া গেটের কাছে অবস্থিত বিকানির হাউস ভারতের একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। রাজস্থানের বিকানিরের মহারাজা গঙ্গা সিং ১৯২৯ সালে প্রায় আট একর জমির ওপর প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। ভারতের স্বাধীনতার পর রাজস্থান সরকার সম্পত্তিটি অধিগ্রহণ করে। বর্তমানে বিজেপিশাসিত রাজস্থান সরকারের রেসিডেন্ট কমিশনারের অধীনে এটি পরিচালিত হয়।
বিকানির হাউসের মতো সাংস্কৃতিক স্থানে শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলে সেখানে শিল্পীর সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু নিয়ে কর্তৃপক্ষের আপত্তি থাকলে তা কীভাবে জানানো হবে, সিদ্ধান্তের কারণ কী হবে এবং শিল্পীকে প্রস্তুতির জন্য কতটা সময় দেওয়া হবে—এ ধরনের প্রশ্নও সামনে আসে।
রাইহানের অভিযোগ, প্রদর্শনীর নকশা আগে পাঠানো সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে আপত্তি জানানোয় তাঁর পক্ষে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রদর্শনী আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পাওয়ায় তাদের সিদ্ধান্তের পূর্ণ প্রেক্ষাপট এখনো স্পষ্ট নয়।
শিল্পের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব
রাইহানের মতে, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শুধু তাদের মালিক বা পরিচালনাকারীদের কাছে সীমাবদ্ধ নয়; বৃহত্তর সমাজের প্রতিও তাদের দায় রয়েছে। কোনো শিল্পকর্ম দেখে কেউ ক্ষুব্ধ হতে পারেন কিংবা অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। কিন্তু সে কারণে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যদি শিল্পকর্মের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে, তাহলে তা অন্যায় বলে মনে করেন তিনি।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাইহান শিল্পের স্বাধীনতা ও জনপরিসরে মতপ্রকাশের অধিকারের প্রশ্নটি সামনে এনেছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক আন্দোলন, জাতীয় প্রতীক এবং সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে তৈরি শিল্পকর্ম প্রদর্শনের ক্ষেত্রে শিল্পী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
রাইহান জানিয়েছেন, বাদ পড়া ছবিগুলো নিয়ে অন্যত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করবেন তিনি। তাঁর প্রদর্শনীটি রোববার পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে, যদিও ৭৪টি ছবি সরিয়ে নেওয়ার পর প্রদর্শনীর মূল বিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে।
শেষ মুহূর্তের এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রদর্শনীটি যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিষয়—শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু নির্ধারণে শিল্পীর স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা। কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিতর্কের প্রশাসনিক দিকটি আরও পরিষ্কার হতে পারে। আপাতত রাইহানের বক্তব্য, তাঁর মায়ের সমালোচনা এবং কংগ্রেস নেতাদের প্রতিক্রিয়াই ঘটনাটিকে ঘিরে প্রকাশ্যে আসা প্রধান অবস্থান।