ইসরায়েলে উচ্চশিক্ষিত তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীদের দেশত্যাগের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে। ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের নির্দেশে পরিচালিত ওই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট, যা পরে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশত্যাগের প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে চলে যাওয়া নাগরিকদের দেশে ফিরে আসার হারও কমে গেছে।
তথ্যসূত্র হিসেবে মিডল ইস্ট আই–সহ একাধিক আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
দেশত্যাগ বনাম প্রত্যাবর্তন: বড় ব্যবধান
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ২ লাখ ১০ হাজারের বেশি ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন। এই সংখ্যা ২০০৯–২০২১ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
গড় হিসেবে বছরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ ইসরায়েল ছাড়ছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে দেশে ফিরে আসা নাগরিকদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় নেট দেশত্যাগের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে।
এই প্রবণতা দেশটির জনসংখ্যাগত ভারসাম্য ও মানবসম্পদ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
তরুণ ও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে প্রবণতা বেশি
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশত্যাগকারীদের বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা। তথ্য অনুযায়ী, দেশ ছাড়াদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে, যেখানে সাধারণ জনসংখ্যায় এই বয়সসীমার হার প্রায় ৩২ শতাংশ।
এছাড়া শিক্ষাগত দিক থেকেও দেখা গেছে, দেশত্যাগকারীদের বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষিত।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী—
৩৩.২ শতাংশ ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী
২১.৫ শতাংশ মাস্টার্স ডিগ্রিধারী
৩.৭ শতাংশ পিএইচডি ডিগ্রিধারী
বিশেষ করে গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের মতো উচ্চচাহিদাসম্পন্ন বিষয়ের স্নাতকদের মধ্যে দেশত্যাগের হার বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে দেশত্যাগ
বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়ায় এই প্রবণতা তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং সামাজিক অস্থিরতাও তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় জন্মগ্রহণকারীরাও ছাড়ছেন দেশ
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০২৪ সালে দেশত্যাগকারীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ ইসরায়েলে জন্মগ্রহণকারী নাগরিক, আর বাকি ৪৮ শতাংশ বিদেশে জন্ম নেওয়া বাসিন্দা।
এটি ইঙ্গিত করছে যে, দেশত্যাগ এখন শুধু অভিবাসী বা বাইরের জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যেও তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ
ইসরায়েলি পার্লামেন্টের ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য গিলাদ কারিভ ওয়াইনেটকে দেওয়া মন্তব্যে বলেন, “আগামী দিনের বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তারা জনসংখ্যার হারের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে দেশ ছাড়ছেন।”
তিনি এই পরিস্থিতিকে ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য একটি “কৌশলগত হুমকি” হিসেবে অভিহিত করেন।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষিত তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীদের এই ধারাবাহিক দেশত্যাগ ইসরায়েলের প্রযুক্তি খাত, গবেষণা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এটি শুধু জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে।