বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় তুরস্ক। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।
তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে।
সাংস্কৃতিক সহযোগিতায় নতুন উদ্যোগ
দুই দেশের আলোচনার পর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রত্নসম্পদ রক্ষা, জাদুঘর ব্যবস্থাপনা, পুরোনো নথি সংরক্ষণ, ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা এবং ঐতিহাসিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ ছাড়া সাংস্কৃতিক সম্পদের অবৈধ পাচার রোধ এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণেও যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে তুর্কি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় গুরুত্ব
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে প্রতিরক্ষা শিল্প। এই খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য উভয় পক্ষ নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিভিত্তিক সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সহায়তার প্রস্তাব
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে তুরস্কের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার বৃত্তি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থন অব্যাহত রাখবে তুরস্ক
রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে তুরস্ক। দেশটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিসরে এই সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়েও তুরস্ক তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে বলে জানানো হয়েছে।
আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব
আলোচনায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং চলমান বিভিন্ন সংঘাত নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে। তুরস্ক মনে করে, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলায় সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের বিকল্প নেই।
হাকান ফিদান বলেন, বিভিন্ন সংকট সমাধানে আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও তুরস্ক একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।