জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও লোডশেডিং নিয়ে বিভিন্ন সদস্যের উদ্বেগের জবাব দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই; তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামোগত সমস্যা ও সঞ্চালন ত্রুটির কারণে কখনও কখনও সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিতে পারে।
রোববার সংসদ অধিবেশনে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং নিয়ে সংসদ সদস্যদের অভিযোগ
প্রশ্নোত্তর পর্বে গোলাম রছুল (যশোর–৪) বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার গ্রামাঞ্চলে দিনে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। একই সঙ্গে নোয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলেও বিদ্যুৎ–ঘাটতির অভিযোগ তোলেন তিনি।
অন্যদিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ অনিয়মিত থাকে। তিনি বিষয়টিকে ‘লোডশেডিং’ না বলে ‘মেরামতশেডিং’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এ সময় তিনি গত অধিবেশনে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিষয়ও স্মরণ করিয়ে দেন।
বিদ্যুৎ মন্ত্রীর ব্যাখ্যা: “ঘাটতি নেই, বিভ্রাট ভিন্ন বিষয়”
এর জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। তার ভাষায়, বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলেই লোডশেডিং হয়, তবে ঝড়বৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা গাছ পড়ে লাইন ছিঁড়ে গেলে যে সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে, সেটিকে লোডশেডিং হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
তিনি বলেন,
“ঝড়বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক কারণে যদি তার ছিঁড়ে যায়, সেটা লোডশেডিং না। সেটি মেরামতের সময় প্রয়োজন হয়। মেরামত শেষ হলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু হয়।”
মন্ত্রী আরও বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ত্রুটি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মাঝে মাঝে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
গ্যাস সংকট ও সার কারখানা নিয়ে ব্যাখ্যা
রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, গ্যাস সরবরাহে সীমাবদ্ধতার কারণে সব খাতে সমানভাবে জ্বালানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে গ্যাসের একটি বড় অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শিল্প ও সার কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।
আশুগঞ্জ সার কারখানার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে সেখানে এখনো পূর্ণ সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হবে।
মন্ত্রী বলেন,
“গ্যাসের উন্নতি হলে আশুগঞ্জসহ সব সার কারখানায় পর্যায়ক্রমে সরবরাহ দেওয়া হবে।”
দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট
বিএনপির সংসদ সদস্য আবুল কালাম–এর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে দেশের দৈনিক সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
তিনি বলেন, বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদা পূরণে সক্ষম হলেও কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সবসময় মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ কাজ এবং ঝড়বৃষ্টিজনিত সমস্যা মিলিয়ে মাঝে মাঝে সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে।
ট্রান্সফরমার চুরি ও পল্লী বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম (পটুয়াখালী–২) সম্পূরক প্রশ্নে পল্লী বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় লোডশেডিং এবং ট্রান্সফরমার চুরির বিষয় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ার পাশাপাশি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাও সমস্যা বাড়াচ্ছে।
এর জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, পল্লী বিদ্যুতের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে ট্রান্সফরমার চুরি প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
সামগ্রিক চিত্র নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত
সংসদে আলোচনায় একদিকে সরকার বিদ্যুৎ ঘাটতি না থাকার দাবি জানালেও, একাধিক সংসদ সদস্য গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ তোলেন। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রকৃত অবস্থা ও সেবার মান নিয়ে সংসদে ভিন্নমত ও বিতর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে সরকার পক্ষ বলছে, উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক কারণে সাময়িক বিঘ্নই মূল সমস্যা, যা সমাধানে কাজ চলছে।