ঢাকা

বিশ্ব মহাসাগর দিবসে সতর্কবার্তা: সমুদ্র গবেষণার সক্ষমতা কমছে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে মহাসাগর। এই বিশাল জলরাশি শুধু পৃথিবীর জলবায়ুই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং অন্তত ৫০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৈশ্বিক অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে মহাসাগর গবেষণা অপরিহার্য।

এই গুরুত্ব তুলে ধরতেই প্রতি বছর ৮ জুন পালিত হয় বিশ্ব মহাসাগর দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—“পুনঃকল্পনা”, অর্থাৎ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সামুদ্রিক প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের আহ্বান। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা—যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান ও গবেষণা তহবিলসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত।

সমুদ্র গবেষণার ‘চোখ–কান’ ব্যবস্থায় হুমকি

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান–এর এক অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ু ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে যুক্তরাষ্ট্রে।

এই অবকাঠামোটি মূলত “Ocean Observatories Initiative (OOI)” নামে পরিচিত, যা পরিচালনা করে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন। এটি সমুদ্রের তলদেশ, পানির নিচের গ্লাইডার, ভাসমান বয়া ও গবেষণা প্ল্যাটফর্মের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।

বিজ্ঞানীরা একে সমুদ্রের “চোখ ও কান” হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ, এই নেটওয়ার্ক থেকেই আবহাওয়া পূর্বাভাস, এল নিনো পর্যবেক্ষণ, ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা, সামুদ্রিক তাপমাত্রা ও বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

বৈশ্বিক সতর্কতা ব্যবস্থায় প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বন্ধ বা সংকুচিত হলে বৈশ্বিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

বিশেষ করে—

ঘূর্ণিঝড় ও ঝড়ের পূর্বাভাস দুর্বল হবে
এল নিনো–লানিনা পর্যবেক্ষণে বড় ভুল দেখা দেবে
সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হিসাব বিকৃত হতে পারে
মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে

গ্লোবাল ক্লাইমেট অবজারভিং সিস্টেম (GCOS)-এর সমুদ্র বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান সাবরিনা স্পাইক সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত “বিপজ্জনক পরিণতি” ডেকে আনতে পারে। তাঁর মতে, সমুদ্র–তথ্য ছাড়া জলবায়ু পূর্বাভাসের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।

গবেষণার ওপর নির্ভরশীল বিশ্বব্যবস্থা

ওশান অবজারভেটরিজ ইনিশিয়েটিভ (OOI) দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক গবেষণার অন্যতম প্রধান তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করছে। এই নেটওয়ার্ক থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করেন—

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা
নীতিনির্ধারকেরা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা
নৌপরিবহন ও মৎস্য খাত

এই ব্যবস্থাটি বৈশ্বিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণ কাঠামো “Global Ocean Observing System (GOOS)”–এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি বন্ধ হলে বৈশ্বিক সামুদ্রিক তথ্য প্রবাহে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে।

অর্থনৈতিক প্রভাবের শঙ্কা

ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট টমাসের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক জন পি. আব্রাহাম বলেন, এই পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বন্ধ করা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাঁর মতে, জলবায়ু–সংক্রান্ত ক্ষতি মোকাবিলায় যে ব্যয় হয়, তার তুলনায় এই গবেষণা অবকাঠামোর ব্যয় অত্যন্ত কম। অথচ এটি দুর্যোগ পূর্বাভাস ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বড় ভূমিকা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে শত শত জলবায়ু বিপর্যয়ে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। গবেষকদের মতে, শক্তিশালী সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে এসব ক্ষতির একটি বড় অংশ আগেভাগে প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও বিকল্প প্রচেষ্টা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইতোমধ্যে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ শক্তিশালী করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। “OceanEye” নামে একটি প্রকল্পে তারা ১০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, যার একটি বড় অংশ বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কে ব্যয় হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো একক দেশ বা অঞ্চল একা এই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। কারণ বৈশ্বিক সমুদ্র ব্যবস্থার তথ্যভান্ডার একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

ইউরোপীয় জলবায়ু গবেষণা সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস-এর সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ প্রধান সামান্থা বার্জেস বলেন, সমুদ্রের তথ্য ছাড়া বিশ্ব “অন্ধের মতো” পথ চলবে।

তিনি বলেন, মহাকাশ থেকে সমুদ্রের গভীরতা ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই সরাসরি সেন্সর ও সমুদ্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা অপরিহার্য।

বিজ্ঞান বনাম নীতি সিদ্ধান্তের টানাপোড়েন

বিশ্ব মহাসাগর দিবসের প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক আবারও সামনে এনেছে একটি বড় প্রশ্ন—জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা কতটা টেকসই থাকবে?

একদিকে সমুদ্র গবেষণার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে, অন্যদিকে নীতিগত সিদ্ধান্তে তহবিল সংকোচনের ফলে সেই গবেষণাই হুমকির মুখে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করা মানে শুধু গবেষণা নয়, বরং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স