কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়েই কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দিচ্ছে। চীনেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। চালকবিহীন ট্যাক্সি, উৎপাদনশিল্প, সফটওয়্যার, কনটেন্ট তৈরি থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র নির্মাণ—প্রায় প্রতিটি খাতেই এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারানো ও আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়াচ্ছে।
চীনের শ্রমবাজারে এ পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ দেশটির কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। আবাসন ও শিক্ষা খাতের মতো বড় কর্মসংস্থানের উৎসগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক মানুষ নিয়মিত চাকরির বাইরে রাইড-হেইলিং, ডেলিভারি ও অন্যান্য গিগ কাজে যুক্ত হয়েছেন। এখন এসব কাজেও এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
চীনের উহান শহরের ৪৫ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক ইয়াও শিননংয়ের অভিজ্ঞতা সেই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
চালকবিহীন ট্যাক্সিতে আয় কমেছে চালকদের
২০২২ সালে চীনা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান বাইদু উহান শহরে ‘অ্যাপোলো গো’ নামে চালকবিহীন ট্যাক্সি পরিষেবা চালু করে। ধীরে ধীরে শহরের রাস্তায় এসব গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকে। যাত্রী পরিবহনে মানুষের পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহারের এই উদ্যোগকে চীনের পরিবহন খাতে এআই বিপ্লবের অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু এর প্রভাব পড়ে প্রচলিত ট্যাক্সিচালকদের আয়ে।
ইয়াও শিননংয়ের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, চালকবিহীন ট্যাক্সি চালুর পর তাঁর আয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ প্রযুক্তির অগ্রগতি তাঁর মতো একজন কর্মীর জন্য সরাসরি জীবিকার ওপর চাপ তৈরি করেছে।
তবে চালকবিহীন গাড়ির প্রযুক্তিও সব সময় নির্ভুল নয়। চলতি বছরের মার্চে অ্যাপোলো গো-এর কয়েকটি গাড়ি হঠাৎ রাস্তার মধ্যে থেমে যায়। এতে যাত্রীরা দীর্ঘ সময় আটকে পড়েন। ঘটনার তদন্ত করতে কয়েক মাসের জন্য উহানের সড়ক থেকে ওই গাড়িগুলোর কিছু সরিয়ে নেওয়া হয়।
এই ধরনের ঘটনা দেখিয়েছে, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দ্রুত এগোলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
প্রযুক্তির বিরুদ্ধে চালকদের প্রতিবাদ
চালকবিহীন ট্যাক্সির বিস্তারের বিরুদ্ধে উহানে ২০২৪ সালে ট্যাক্সিচালকদের বিক্ষোভও হয়েছিল। তাঁদের উদ্বেগের মূল বিষয় ছিল জীবিকা ও আয় কমে যাওয়া।
তবে বিক্ষোভে কতজন চালক অংশ নিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। চীনে অনলাইনে ও গণমাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বা কর্তৃপক্ষের জন্য অস্বস্তিকর বিষয়বস্তুর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় বিক্ষোভের খবর দ্রুত সেন্সর করা হয়েছিল।
এ ঘটনা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের আরেকটি দিক সামনে আনে। এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কর্মীদের উদ্বেগ শুধু চাকরি হারানোর আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেই উদ্বেগ প্রকাশের সুযোগও সীমিত।
শ্রমবাজার যখন আগে থেকেই চাপে
চীনে এআইয়ের দ্রুত বিস্তার এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দেশটির শ্রমবাজার ইতিমধ্যে নানা ধরনের চাপে রয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে আবাসন খাত চীনের অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি ছিল। একইভাবে শিক্ষা খাতেও বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। কিন্তু বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এসব খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে।
ফলে অনেক কর্মী নিয়মিত চাকরি হারিয়ে বিকল্প আয়ের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ রাইড-হেইলিং, খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য গিগ অর্থনীতির কাজে যুক্ত হয়েছেন।
কিন্তু এখন এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি যদি এসব কাজেও মানুষের প্রয়োজন কমিয়ে দেয়, তাহলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বাড়ছে অনানুষ্ঠানিক ও নমনীয় কর্মসংস্থান
একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর চীনে নমনীয় বা অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে থাকা মানুষের সংখ্যা ৩২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি।
অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে এই ধরনের কর্মসংস্থানের পরিধি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
চীনের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত এ ধরনের কাজে যুক্ত হতে পারেন বলে ওই হিসাব থেকে ধারণা পাওয়া যায়। বিশাল এই জনগোষ্ঠী নিয়মিত বেতনভিত্তিক চাকরির পরিবর্তে এমন কাজ করছেন, যেখানে আয় অনেক সময় নির্ভর করে কাজের সংখ্যা, প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম, চাহিদা এবং ব্যক্তিগত সক্ষমতার ওপর।
গিগ অর্থনীতির দ্রুত বিস্তার তাই একদিকে চীনের শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে কর্মীদের আয় ও সামাজিক নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করেছে।
এখন সেই অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআই।
এআইয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার নতুন বাস্তবতা
এআই শুধু মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে—বিষয়টি এত সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। একই কর্মীকে আগের চেয়ে কম সময়ে বেশি কাজ করতে হচ্ছে। কোথাও কর্মীর সংখ্যা কমছে, আবার কোথাও নতুন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে।
ফলে কর্মীদের সামনে এখন দুটি পথ—এআইয়ের কারণে সৃষ্ট প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে গিয়ে কাজ হারানো, অথবা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজের দক্ষতা বাড়ানো।
চীনের কর্মীদের জন্য দ্বিতীয় পথটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
যেসব কাজে সহজে নিয়ম নির্ধারণ করা যায়, সেসব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে দ্রুত বাড়ছে। পরিবহন খাতে চালকবিহীন গাড়ি তার একটি উদাহরণ। একইভাবে উৎপাদন কারখানায় রোবট, অফিসের কাজে এআই সফটওয়্যার এবং কনটেন্ট তৈরিতে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের ফলে মানুষের প্রচলিত দায়িত্বও বদলে যাচ্ছে।
এর অর্থ হলো, শুধু একই কাজ ভালোভাবে করতে পারলেই ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। কর্মীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মতো দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
চাকরির নিরাপত্তা বনাম উৎপাদনশীলতা
চীনের জন্য এআইয়ের বিস্তার একই সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জ।
চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্পোৎপাদনকারী দেশ। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশটির জন্য এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলোও চীনকে দ্রুত অটোমেশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় যদি বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রচলিত কাজের সুযোগ কমে যায়, তাহলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে গিগ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন তাদের আয় কমে যাওয়া কিংবা কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়া সামগ্রিক ভোগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
চালকবিহীন ট্যাক্সি শুধু একটি উদাহরণ
উহানের ট্যাক্সিচালকদের ঘটনা মূলত বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি ছোট উদাহরণ। আগামী দিনে এআইয়ের প্রভাব আরও বহু পেশায় পড়তে পারে।
চালক, কাস্টমার সার্ভিস কর্মী, অনুবাদক, হিসাবরক্ষক, কনটেন্ট নির্মাতা, সফটওয়্যার কর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অফিসকাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজন পুরোপুরি শেষ না হলেও কর্মীর সংখ্যা কমে যেতে পারে বা একজন কর্মীকে আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হতে পারে।
ফলে এআইয়ের প্রভাব পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু ‘কত চাকরি বিলুপ্ত হলো’—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং কত ধরনের কাজ বদলে গেল, কর্মীদের আয় কীভাবে পরিবর্তিত হলো এবং নতুন দক্ষতার জন্য কত মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া গেল—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গিগ কর্মীদের সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
গিগ অর্থনীতির কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তাঁদের অনেকেরই স্থায়ী চাকরির মতো সুরক্ষা, নির্দিষ্ট বেতন বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই।
রাইড-হেইলিংয়ের একজন চালকের আয় যদি স্বয়ংক্রিয় গাড়ির কারণে কমে যায়, তাঁর সামনে বিকল্প কর্মসংস্থান পাওয়া সহজ নাও হতে পারে। আবার নতুন কোনো কাজে যেতে হলে নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন হতে পারে।
চীনে যখন নমনীয় ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত মানুষের সংখ্যা কয়েক বছরের ব্যবধানে দ্রুত বেড়েছে, তখন এআইয়ের বিস্তার সেই জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ বা নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রযুক্তির অগ্রগতি থামবে না, বদলাতে হবে কর্মীদের
এআইয়ের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিয়ে প্রচলিত চাকরি রক্ষা করা সম্ভব হবে না—এমন বাস্তবতাই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে এবং ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই কম খরচে বেশি উৎপাদনের পথ খুঁজবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের কাজের ভবিষ্যৎ শেষ। বরং কাজের ধরন বদলাবে।
যেসব কাজ এআই সহজে করতে পারে, সেসব কাজের পাশাপাশি মানুষের সৃজনশীলতা, বিচারবোধ, নেতৃত্ব, আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ এবং জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার মূল্য বাড়তে পারে।
চীনের কর্মীদের জন্য তাই প্রতিযোগিতাটি শুধু এআইয়ের সঙ্গে নয়; বরং এআইকে ব্যবহার করতে পারা কর্মী এবং তা না পারা কর্মীর মধ্যেও তৈরি হচ্ছে।
উহানের ট্যাক্সিচালক ইয়াও শিননংয়ের আয় কমে যাওয়ার ঘটনা সেই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র। একদিকে চালকবিহীন গাড়ি মানুষের দীর্ঘদিনের পেশাকে চ্যালেঞ্জ করছে, অন্যদিকে সেই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও সামনে আসছে।
শেষ পর্যন্ত চীনের শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হবে, তা শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। সরকার কীভাবে কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ দেয়, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং প্রযুক্তির সুফল ও ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য আনে—তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে।
কারণ এআই যত দ্রুতই এগিয়ে যাক, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির নয়—মানুষের জীবিকা ও দক্ষতাকে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।