মাত্র ছয় দিনের একটি যুদ্ধ। কিন্তু তার অভিঘাত ছয় দশক পরেও বহন করছে মধ্যপ্রাচ্য। ১৯৬৭ সালের জুনে সংঘটিত সেই যুদ্ধ শুধু কয়েকটি দেশের সীমান্তই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা—যার প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায় গাজা, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমকে ঘিরে চলমান সংঘাতে।
Six-Day War-এর এই অধ্যায়কে ইতিহাসবিদরা মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ভূরাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখেন। যুদ্ধের আগে ও পরে—দুই সময়ের মধ্যকার ব্যবধান যেন পুরো অঞ্চলকে দুটি ভিন্ন যুগে ভাগ করে দেয়।
যুদ্ধের পেছনের দীর্ঘ উত্তেজনা
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আরব বিশ্বের সঙ্গে দেশটির সংঘাত চলছিল। প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিন প্রশ্নের যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তা পরবর্তী দুই দশকে আরও গভীর হয়।
পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম তখন ছিল জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে, আর গাজা শাসন করছিল মিসর। অন্যদিকে লাখো ফিলিস্তিনি শরণার্থী হয়ে আশপাশের আরব দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, যা পুরো অঞ্চলে একটি স্থায়ী মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে।
এ সময় আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের-এর নেতৃত্বে। আরব বিশ্বের ঐক্য ও পশ্চিমা প্রভাবমুক্তির স্বপ্ন তাঁকে আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
উত্তেজনা থেকে যুদ্ধের দিকে
১৯৬০-এর দশকে সীমান্ত সংঘর্ষ, পানিসম্পদ নিয়ে বিরোধ এবং ফিলিস্তিনি গেরিলাদের আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তোলে। সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে নিয়মিত আকাশযুদ্ধ এবং জর্ডানের ভূখণ্ডে হামলা উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
১৯৬৭ সালের মে মাসে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। সিনাই উপদ্বীপে মিসরীয় সেনা মোতায়েন, জাতিসংঘ বাহিনী প্রত্যাহার এবং তিরান প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ ইসরায়েলের দৃষ্টিতে নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে। অন্যদিকে আরব বিশ্বের একাধিক দেশ সামরিক জোট গঠন করে।
এই পরিস্থিতিকে ঘিরে দুই পক্ষই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে।
৫ জুন: যুদ্ধের সূচনা
৫ জুন ভোরে ইসরায়েল আকস্মিক বিমান হামলা চালায় মিসরের ঘাঁটিগুলোর ওপর। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিসরের বিমানবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। একই সঙ্গে সিরিয়া ও জর্ডানের ঘাঁটিগুলোতেও আঘাত হানা হয়।
বিমান সহায়তা হারিয়ে আরব বাহিনী দ্রুত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যায়।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইসরায়েল গাজা, সিনাই উপদ্বীপ এবং পশ্চিম তীরের বড় অংশ দখল করে নেয়।
৬ দিনে বদলে যাওয়া মানচিত্র
যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতিতে ইসরায়েল দখল করে নেয়—
গাজা উপত্যকা
সিনাই উপদ্বীপ
পশ্চিম তীর
পূর্ব জেরুজালেম
গোলান মালভূমি
এই ভূখণ্ডগুলো দখলের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পুরোপুরি বদলে যায়।
পূর্ব জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ছিল সবচেয়ে স্পর্শকাতর ঘটনা, কারণ এটি ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টান—তিন ধর্মের জন্যই পবিত্র নগরী।
আত্মরক্ষা নাকি পরিকল্পিত যুদ্ধ?
যুদ্ধের পর ইসরায়েল দাবি করে, এটি ছিল আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ। তাদের যুক্তি ছিল, আরব দেশগুলোর সামরিক প্রস্তুতি এবং নাসেরের পদক্ষেপ ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত গবেষণা ও কিছু ইসরায়েলি নেতার বক্তব্য এই ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যুদ্ধকালীন সেনা কমান্ডার ও পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিন এবং প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারী মোশে দায়ান-এর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু প্রতিক্রিয়া ছিল না—বরং আগাম কৌশলগত পরিকল্পনাও এতে ভূমিকা রেখেছিল।
ব্যর্থ কূটনীতি ও জাতিসংঘ প্রস্তাব
যুদ্ধ শেষে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২৪২ নম্বর প্রস্তাব পাস করে, যেখানে দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এই প্রস্তাব ভবিষ্যতের শান্তি আলোচনার ভিত্তি হলেও বাস্তবে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।
পরবর্তী সময়ে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন শুরু হয়, যা আজও চলমান একটি বড় রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্র।
ফিলিস্তিনিদের ওপর দীর্ঘ ছায়া
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মানবিক প্রভাব পড়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর। লাখো মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হন এবং পশ্চিম তীর ও গাজা ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
চলাফেরা, অর্থনীতি, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই সামরিক শাসনের প্রভাব পড়ে।
এই পরিস্থিতি পরবর্তী দশকগুলোতে ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ ও সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করে।
আরব বিশ্বের রাজনৈতিক বিপর্যয়
যুদ্ধের ফলাফল আরব বিশ্বের জন্য ছিল গভীর পরাজয় ও রাজনৈতিক ধাক্কা। মিসর, জর্ডান ও সিরিয়ার হাজার হাজার সেনা নিহত হন, আর ইসরায়েল তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতির মুখে পড়ে।
এই পরাজয়ের পর গামাল আবদেল নাসের পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও জনমতের চাপে তিনি তা প্রত্যাহার করেন। তবে আরব জাতীয়তাবাদের যে ঢেউ তিনি তৈরি করেছিলেন, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা তৈরি করে, যার প্রভাব আজকের সংঘাতগুলোতেও স্পষ্ট।
আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ভিত্তি
ছয় দিনের যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক কাঠামো, সীমান্ত রাজনীতি এবং পরিচয়ের সংকটকে স্থায়ীভাবে রূপ দিয়েছে।
আজ গাজা, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমকে ঘিরে যে উত্তেজনা, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি অনেকটাই এই যুদ্ধেই প্রোথিত। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত বোঝার জন্য ১৯৬৭ সালের সেই ছয় দিনকে অতিক্রম করা যায় না।