ঢাকা

ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়, যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেতৃত্বে ১৫ বাংলাদেশি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। তবে তাঁরা শুধু একাডেমিক সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না; নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে অন্তত ১৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

শিক্ষাবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বগুণ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বৈশ্বিক পরিসরে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতারও প্রতিফলন।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বের উজ্জ্বল উপস্থিতি

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন একাধিক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।

Anglia Ruskin Students' Union–এর লন্ডন ক্যাম্পাসে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। আইন বিভাগের এ শিক্ষার্থী ১ হাজার ৬২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ছাত্রনেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।

অন্যদিকে The Students' Union at UWE–এর ভাইস প্রেসিডেন্ট (এডুকেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খাদিজা হোসেন অড়লা। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর একাডেমিক স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা এই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের অধিকার, আবাসন সমস্যা এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

দ্বিতীয়বারের মতো আস্থা অর্জন

University for the Creative Arts Students' Union–এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়েছেন কুষ্টিয়ার শায়েখ হাসান। ডিজিটাল মার্কেটিং বিভাগের এই শিক্ষার্থী শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকার কারণে পুনরায় শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করেছেন।

একইভাবে University of South Wales Students' Union–এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইরফান রহমান। কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক এই শিক্ষার্থী এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।

কল্যাণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগে বাংলাদেশিরা

University of Gloucestershire Students' Union–এর ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ডাইভারসিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইফফাত জাহান। প্রায় এক দশক পর উচ্চশিক্ষায় ফিরে এসে তিনি নির্বাচনে জয়ী হন এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর শিশু পরিচর্যা সুবিধা, মাতৃদুগ্ধ কর্নার এবং নামাজের কক্ষ স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেন।

গাজীপুরের টঙ্গীর শিক্ষার্থী মো. সাইফ মোল্লা চঞ্চল নির্বাচিত হয়েছেন Greenwich Students' Union–এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তিনি মানসিক স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাস পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে কাজ করছেন।

এদিকে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলসের ছাত্র সংসদে ভাইস প্রেসিডেন্ট (এডুকেশন) পদে নির্বাচিত হয়েছেন এ বি এম রাহাত মুবাশশির। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর একাডেমিক প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি।

লন্ডনে বাংলাদেশিদের নেতৃত্ব

London Met Students' Union–এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাজ্য মন্ডল। ৮৭৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়া এই শিক্ষার্থী শিক্ষার্থীদের অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (অ্যাকটিভিটিজ অ্যান্ড অপরচুনিটিজ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাহিদ বিনতে ইসলাম। টানা দুই মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে তিনি সহশিক্ষা কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।

এ ছাড়া ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইকুইটি অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নোয়াখালীর সৌমিত্র পাল। তিনি অ্যান্টি-রেসিজম, অ্যান্টি-হ্যারাসমেন্ট এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস গঠনে কাজ করছেন।

প্রেসিডেন্ট পদে ইতিহাস গড়া

Hertfordshire Students' Union–এর ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জুবায়ের আহম্মেদ। প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্বকারী এই পদে থেকে তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ করছেন।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পেকস অফিসার এবং বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রংপুরের মুহতাসিম সাদাত নিবির। তিনি প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষা, পরিবহনসেবার উন্নয়ন এবং একাডেমিক অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করার উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন।

ওয়েলসে বাংলাদেশিদের সাফল্য

ওয়েলসের Wrexham Students' Union–এর ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের শিক্ষার্থী হাফসা আজমারি ফারজু। ‘সাসটেইনেবিলিটি চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিক্ষার্থী শিক্ষার্থীদের অধিকার, সমতা এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন।

অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ওয়েলফেয়ার) পদে টানা দুইবার নির্বাচিত হয়েছেন এম ইমাম হোসাইন। শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, মানসিক সহায়তা এবং সংকট মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশে অবদান রাখার স্বপ্ন

ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অনেকেই ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

নাঈম হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অর্জিত নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান। তাঁর লক্ষ্য সমতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সাম্যের ভিত্তিতে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নেও তিনি কাজ করতে আগ্রহী।

খাদিজা হোসেন অড়লা বলেন, শিক্ষার্থীনেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে অর্জিত অভিজ্ঞতা শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জননীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানসম্মত শিক্ষা, সমান সুযোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই সমাজ গঠনের ভিত্তি।

আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক প্রতিনিধিত্ব

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থী নেতৃত্বের মাধ্যমে তাঁরা বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশে সহায়ক হবে।

একই সঙ্গে এসব অর্জন নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠছে। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তাঁরা প্রমাণ করছেন, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা শুধু শ্রেণিকক্ষেই নয়, নীতিনির্ধারণ ও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও সমান দক্ষতা ও সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স