ঢাকা

জলবায়ু পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাই হুমকিতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কঠোর সতর্কতা বিজ্ঞানীদের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো ক্রমেই আরও উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৭০ জনের বেশি বিজ্ঞানী। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় অর্থায়ন কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক উষ্ণতা পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়ছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বার্ষিক যৌথ বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এতে মানবসৃষ্ট রেকর্ড উষ্ণতা, সমুদ্রের তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি এএফপি (Agence France-Presse) সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

‘গুরুতর অসুস্থ রোগীর মতো পৃথিবী’

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যানেল (আইপিসিসি)–এর সদস্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিজ্ঞানী এই গবেষণায় অংশ নেন।

সহলেখক ও আয়ারল্যান্ডের মায়নুথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিটার থর্ন বলেন, পৃথিবীর জলবায়ু সূচকগুলো এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যা একটি গুরুতর অসুস্থ রোগীর শরীর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তুলনীয়।

তিনি বলেন, “এই সূচকগুলো দিন দিন আরও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে। একই সঙ্গে আমি আমার জীবনে প্রথমবার দেখছি, বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থাগুলো হয় পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হচ্ছে, নয়তো ঝুঁকির মুখে পড়ছে।”

২০২৫ সালে রেকর্ড উষ্ণতা

‘আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ডেটা’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে—

২০২৫ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ছিল প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি
এর মধ্যে ১.৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসই মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের আগেই বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রম করতে পারে।

এই সীমাটি ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব কমানো।

পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে

গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবী এখন দ্রুতগতিতে তাপ সঞ্চয় করছে। সূর্য থেকে আসা শক্তির তুলনায় পৃথিবী যে পরিমাণ তাপ নির্গত করতে পারছে না, সেই ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে।

লিডস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিয়ার্স ফস্টার বলেন, এই ভারসাম্যহীনতা ১৯৭০-এর দশক থেকে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক দশকে তা দ্বিগুণ হয়েছে।

তিনি বলেন, “মানুষ পরিবেশে হস্তক্ষেপ না করলে এই ভারসাম্য স্বাভাবিক থাকত। কিন্তু এখন এটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।”

উষ্ণায়নের দুই প্রধান কারণ

বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন—

গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বৃদ্ধি
শিল্পকারখানা ও যানবাহন থেকে কার্বন ডাই–অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্যাস রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অ্যারোসল দূষণ হ্রাস
বায়ুমণ্ডলে থাকা ধূলিকণা ও অ্যারোসল কমে যাওয়ায় সূর্যালোক প্রতিফলনের ক্ষমতা কমে গেছে, ফলে পৃথিবী বেশি গরম হচ্ছে।

তবে গবেষকরা বলছেন, এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে কার্বন ডাই–অক্সাইড।

‘কার্বন বাজেট’ দ্রুত শেষের পথে

বিজ্ঞানীরা জানান, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম না করতে হলে পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট “কার্বন বাজেট” রয়েছে।

বর্তমান নিঃসরণের গতিতে এই বাজেট আগামী তিন বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ফরাসি আবহাওয়া দপ্তরের জলবায়ুবিজ্ঞানী অরেলিয়ান রিবস বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।”

সমুদ্রের উচ্চতা ও তাপপ্রবাহে উদ্বেগ

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে—

১৯০১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার
বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে ৩.৮৪ মিলিমিটার হারে সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ছে
সমুদ্রের তাপপ্রবাহের দিন সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে
২০২৫ সালে সমুদ্র গড়ে ৬৫ দিন তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ছিল

এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণব্যবস্থা হুমকির মুখে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক এখন অর্থায়ন সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা জানান—

যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের উপগ্রহ কর্মসূচি অনিশ্চয়তায় পড়েছে
সমুদ্র পর্যবেক্ষণ যন্ত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে
জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার অর্থায়ন কমেছে
আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ কমে গেছে

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের সামান্থা বার্গেস বলেন, “এই পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে আমরা সমুদ্র ও আবহাওয়ার পরিবর্তন বুঝতেই পারব না।”

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র বোঝার জন্য যে বৈশ্বিক তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা রয়েছে, তা এখনই রক্ষা করা জরুরি।

তাদের মতে, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে গেলে নীতি নির্ধারণ, দুর্যোগ পূর্বাভাস এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা—সবই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

পর্যবেক্ষণ

নতুন এই বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটের আরও দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে পর্যবেক্ষণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টি ভবিষ্যৎ জলবায়ু নীতি গ্রহণকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স