মার্কিন ধনকুবের ও মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বলেছেন, কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এপস্টিন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সংবেদনশীল তথ্য—বিশেষ করে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনুগত না থাকার বিষয়—ব্যবহার করে তাঁকে চাপের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের হাউস ওভারসাইট কমিটির সদস্যদের সামনে রুদ্ধদ্বার শুনানিতে তিনি এ বক্তব্য দেন। কংগ্রেসের তদন্ত কার্যক্রমে এটি ছিল অন্যতম উচ্চপর্যায়ের সাক্ষ্য।
‘অপরাধের কোনো আভাস পাইনি’: গেটস
উদ্বোধনী বক্তব্যে বিল গেটস বলেন, তিনি কখনোই এপস্টিনকে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে দেখেননি এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সন্দেহও তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, “আমি কখনো তাঁর দ্বীপ, খামারবাড়ি বা ফ্লোরিডার বাসায় যাইনি। আমি কোনো ভুক্তভোগীর সঙ্গে কখনো যুক্ত হইনি।”
গেটস আরও জানান, এপস্টিন তাঁর সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, তবে তিনি এতে আগ্রহ দেখাননি এবং সাড়া দেননি।
ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ
গেটস তাঁর লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, এপস্টিন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু সংবেদনশীল তথ্য জেনে ফেলেছিলেন, যার মধ্যে ছিল তাঁর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়ও।
তিনি বলেন, এসব তথ্য ব্যবহার করে এপস্টিন তাঁকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন, যা তাঁর পরিবারকে কষ্ট দিয়েছে। তবে এই ব্যক্তিগত বিষয়গুলো এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক বা দাতব্য সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ‘সীমিত’
গেটস জানান, তাঁর সঙ্গে এপস্টিনের পরিচয় হয় ২০১১ সালে। ওই সময় এপস্টিন তাঁকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, এপস্টিনের পূর্ববর্তী আইনি জটিলতার কথা তিনি জানতেন, তবে তার অপরাধের মাত্রা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা ছিল না। এ কারণে যথাযথ যাচাই না করেই তিনি সম্পর্কটি বজায় রেখেছিলেন, যা ছিল তাঁর ভাষায় “একটি ভুল সিদ্ধান্ত”।
গেটস বলেন, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তাঁদের যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
‘এপস্টিন নিজেই নিজেকে ই–মেইল লিখতেন’ দাবি
সাক্ষ্যে বিল গেটসের বিরুদ্ধে ওঠা কিছু অভিযোগযুক্ত ই–মেইল প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলা হয়। এসব ই–মেইলে দাবি করা হয়েছিল, এপস্টিন তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন এবং কিছু আপত্তিকর বিষয় উল্লেখ করেছেন।
গেটস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি মনে করেন এপস্টিন অনেক সময় নিজেই নিজেকে ই–মেইল পাঠাতেন এবং সেগুলো বাস্তব ঘটনার প্রতিফলন নয়।
ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া পরে সাংবাদিকদের জানান, গেটস স্পষ্টভাবে এসব অভিযোগ—বিশেষ করে যৌনবাহিত রোগ (এসটিডি) সংক্রান্ত দাবি—অস্বীকার করেছেন।
আইনপ্রণেতাদের প্রশ্ন ও কমিটির অবস্থান
হাউস ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার জানান, এই সাক্ষ্যে প্রশ্নের পরিধিতে কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না এবং যেকোনো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, গেটস সাক্ষ্য দিতে বাধ্য ছিলেন না, তবে তিনি সহযোগিতার মনোভাব দেখিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া গেটসকে “কিছুটা প্রতিরক্ষামূলক কিন্তু সহযোগিতাপূর্ণ” হিসেবে বর্ণনা করেন।
এপস্টিন–গেটস সম্পর্ক ঘিরে নতুন নথি
কংগ্রেস তদন্ত কমিটি সম্প্রতি প্রকাশিত নথিতে গেটস ও এপস্টিনের যোগাযোগের বিভিন্ন বিবরণ পায়। এসবের মধ্যে বৈঠকের সময়সূচি, ই–মেইল এবং দাতব্য উদ্যোগ সম্পর্কিত আলোচনা রয়েছে।
তবে এসব যোগাযোগ মূলত ২০০৮ সালে এপস্টিন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরবর্তী সময়ের বলে জানা গেছে।
নথিতে এপস্টিনের লেখা কিছু খসড়া ই–মেইলেও গেটসকে ঘিরে বিতর্কিত দাবি করা হয়, যার কোনোটি যাচাই করা হয়নি এবং কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
গেটসের অবস্থান: ‘মারাত্মক ভুল ছিল সম্পর্ক রাখা’
বিল গেটস বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সম্পর্ক বজায় রাখা ছিল তাঁর “মারাত্মক ভুল”।
তিনি জানান, তিনি কখনোই এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাননি এবং সেখানে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাও করেননি।
তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে
হাউস ওভারসাইট কমিটি জানিয়েছে, এপস্টিন–সম্পর্কিত তদন্তে আগামী মাসগুলোতে আরও কয়েকজন উচ্চপ্রোফাইল ব্যক্তিকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করা হতে পারে।
এর মধ্যে আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বরা থাকতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
পর্যবেক্ষণ
এপস্টিন–গেটস সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে কংগ্রেসের তদন্ত শুরু হওয়ায় বিষয়টি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। যদিও গেটস তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন এবং কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর অতীত যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।