যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দিয়ে হরমুজ প্রণালি ‘পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে’ বলে দাবি করলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, “বিশ্বের সব জাহাজ, ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ শুরু হোক!”
তবে বিভিন্ন সামুদ্রিক ট্র্যাকিং তথ্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ বলছে—ঘোষণার পরও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির ঘোষণার পর মাত্র কয়েকটি জাহাজ প্রণালি পার হলেও উপসাগরীয় এলাকায় এখনো শত শত জাহাজ আটকে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দ্রুত শুরু না হওয়ার পেছনে মূলত তিনটি বড় বাধা রয়েছে—নিরাপত্তা ঝুঁকি, মাইন আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য টোল বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
১. নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সামরিক উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কার্যত একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও মাঠপর্যায়ে আস্থা এখনো ফেরেনি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইওএস রিস্ক গ্রুপের বিশ্লেষক মার্টিন কেলি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো জাহাজের ক্যাপ্টেনকে এই প্রণালি পার করতে হলে “অস্বাভাবিক সাহস” দেখাতে হবে।
গত কয়েক মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষ থেকেই একাধিক সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অভিযান ও ইরানের পাল্টা অবস্থান জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মেরিন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বড় সমস্যা হলো—চুক্তির ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগ ও স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো আস্থা তৈরি হয়নি।
২. মাইন ও সামুদ্রিক বিস্ফোরক হুমকি
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে পানির নিচে থাকা সম্ভাব্য মাইন ও বিস্ফোরক ঝুঁকি।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত শুরুর সময় থেকেই ইরান সম্ভাব্য মাইন স্থাপনের হুমকি দিয়ে আসছিল। এরপর থেকেই সন্দেহজনক বস্তু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়ে একাধিক সতর্কতা জারি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক সূত্র দাবি করেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে কিছু এলাকায় মাইন স্থাপন করা হয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা যায়নি।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থা আইএমও–এর মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিনগুয়েজ বলেন, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে হলে প্রথম কাজ হলো মাইন অপসারণ, যা সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগতে পারে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত। ফলে দ্রুত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. টোল, নিয়ন্ত্রণ ও অনিশ্চিত প্রশাসনিক কাঠামো
হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরে একটি অবাধ আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এলেও নতুন পরিস্থিতিতে এটি নিয়ন্ত্রণ ও ফি ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ভবিষ্যতে প্রণালির ব্যবস্থাপনায় নতুন কর্তৃপক্ষ গঠন এবং জাহাজ চলাচলের জন্য ‘সার্ভিস ফি’ আরোপ করা হতে পারে।
এ ধরনের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, নতুন কোনো টোল বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হলে তা জাহাজ চলাচলের গতি কমিয়ে দিতে পারে এবং বাণিজ্যিক খরচ বাড়াতে পারে।
সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে কিছু প্রাকৃতিক জলপথে অবাধ চলাচলের অধিকার থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে কার্যত সেই স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে।
বাজার বিশ্লেষক নবীন দাস বলেন, নতুন কোনো ফি বা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হলে তা “প্রতিদিনের জাহাজ চলাচলে লজিস্টিক বাধা” তৈরি করবে।
জাহাজ মালিক ও ক্যাপ্টেনদের ‘অপেক্ষা নীতি’
মেরিনট্রাফিকের তথ্যে দেখা গেছে, চুক্তির ঘোষণা সত্ত্বেও উপসাগরীয় অঞ্চলে শত শত ট্যাংকার ও কার্গো জাহাজ এখনো অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি স্পষ্ট “ওয়েট অ্যান্ড সি” (wait and see) পরিস্থিতি। কোনো পক্ষই প্রথম ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
উইন্ডওয়ার্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক মিশেল উইস বকম্যান বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা জাহাজ মালিকদের মনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে তারা সরাসরি প্রবেশের আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
উপসংহার: রাজনৈতিক ঘোষণা বনাম বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে রাজনৈতিক ঘোষণা দ্রুত আসতে পারে, কিন্তু বাস্তব জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে অনেক বেশি।
একদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি, অন্যদিকে মাইন ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বাধা একসঙ্গে কাজ করায় পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল হয়নি।
বিশ্লেষক দিমিত্রিস অ্যাম্পাৎজিদিসের মতে, প্রণালি হয়তো রাজনৈতিকভাবে “খোলা” দেখানো হবে, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে আগের মতো স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।